প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশে নির্মাণ সামগ্রীর বাজারে নতুন এক ধাক্কা লেগেছে। রডের দাম সম্প্রতি টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বাড়ার পর এবার সিমেন্টের দামও বেড়েছে। দেশব্যাপী সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বস্তাপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে। এই নতুন মূল্য সমন্বয় নির্মাণ খাতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের হালিশহরের রড ও সিমেন্ট ডিলার আরএম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মহিদুল মাওলা প্রথম আলোকে জানান, “সিমেন্টের দাম বস্তাপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। ফলে একই সপ্তাহে নির্মাণের দুটি প্রধান উপকরণ—রড ও সিমেন্ট—দুটোরই দাম বেড়েছে।” বিক্রেতারা জানান, সিমেন্টের দাম ব্র্যান্ডভেদে ভিন্ন। নতুন মূল্য সমন্বয়ের পরে বস্তাপ্রতি ৫০ কেজি সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২৫ টাকায়। এর মানে টনপ্রতি সিমেন্টের দাম বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। অন্যদিকে, বড় ব্র্যান্ডের রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়ে বর্তমানে ৯০ থেকে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে।
বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাল্টা হামলার ফলে সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ শিপিং পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্যের পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপথে জাহাজভাড়া বেড়ে গেছে এবং শিপিং কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করেছে।
সিমেন্ট শিল্পের জন্য কাঁচামালের মূল উৎসই আমদানির উপর নির্ভরশীল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ৩৯টি সিমেন্ট কোম্পানি মোট ৪ কোটি ৩৬ লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ এবং স্ল্যাগ। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এই কাঁচামালের প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নতুন কাঁচামাল সরবরাহ থেমে গেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, “সিমেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় সব কাঁচামালের দামই বিশ্ববাজারে বেড়েছে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে টনপ্রতি ক্লিংকারের দাম ছিল প্রায় ৪২ ডলার, যা এখন বেড়ে প্রায় ৫৮ ডলারে পৌঁছেছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “অনেক কোম্পানির কাছে পূর্বে আমদানিকৃত কাঁচামাল মজুত থাকায় পুরোপুরি মূল্য সমন্বয় এখনো হয়নি। তবে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকলে সিমেন্টের দাম আরও সমন্বয় করতে হতে পারে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, রড এবং সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি শুধু নির্মাণ খাতকে নয়, আবাসন খাতে সাধারণ মানুষের জন্যও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গৃহনির্মাণের খরচও বৃদ্ধি পাবে। নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে প্রকল্প মালিকরা—সবারই সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
এছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির একটি সংবেদনশীল খাতকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। নির্মাণ খাত দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং এর সরবরাহ ও দাম বৃদ্ধির ফলে অন্যান্য শিল্পও প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে সরকারের হস্তক্ষেপ না হলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য সিমেন্ট ও রড ক্রয় কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন নির্মাণ সাইটে গিয়ে দেখা গেছে, ঠিকাদাররা ইতিমধ্যেই নতুন দাম অনুযায়ী কন্ট্রাক্টের খরচ সমন্বয় করছেন। অনেক প্রকল্পের সময়সূচী কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে অতিরিক্ত ব্যয় সামলানো যায়। তবে ছোট ব্যবসায়ী ও গৃহনির্মাণকারী যারা সরাসরি সিমেন্ট ও রড কিনে কাজ করেন, তাদের জন্য এই দাম বৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবসায়ীরা কৌশলগত সমাধানও খুঁজছেন। কেউ মজুতকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে আংশিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, কেউ সরাসরি বিক্রেতার সঙ্গে আলোচনা করে খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকলে স্থানীয় বাজারেও এ প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, রডের পর সিমেন্টের দাম বৃদ্ধিও প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সমস্যাগুলো বাংলাদেশে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নির্মাণ খাতের জন্য এটি নতুন এক চ্যালেঞ্জ, যা ব্যবসায়ী, সরকার এবং সাধারণ মানুষকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।