বিশ্বে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশে উল্টো বৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
বিশ্বে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশে উল্টো বৃদ্ধি

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমার প্রবণতা থাকলেও বাংলাদেশের বাজারে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চালের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য হারে দাম কমলেও দেশের বাজারে উল্টো বেড়েছে দাম। একই প্রবণতা দেখা গেছে পাম অয়েল, মসুর ডাল, রসুন ও আদাসহ একাধিক নিত্যপণ্যে। সরকারের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের সর্বশেষ বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে দেশের বাজার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক দামের প্রভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল বাংলাদেশি ভোক্তারা পাচ্ছেন না মূলত উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারণে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ছিল প্রতি টন ৫২৯ ডলার, যা এখন কমে ৪৩৩ ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৮ শতাংশের বেশি মূল্য হ্রাস ঘটেছে। একইভাবে ১৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দামও ৫২০ ডলার থেকে কমে ৪২৩ ডলারে নেমেছে। কিন্তু এই বড় ধরনের মূল্যপতনের কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেশের বাজারে দেখা যায়নি।

দেশের বাজারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। মোটা চাল, বিশেষ করে স্বর্ণা জাতের চালের দাম এক বছরে ৫২ থেকে ৫৭ টাকা কেজি থেকে বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি। মাঝারি মানের চালের ক্ষেত্রেও সামান্য হলেও দাম বেড়েছে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা বিশ্ববাজারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই অমিলের প্রধান কারণ হলো দেশের উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। তার মতে, বাংলাদেশে অধিকাংশ চাল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে আসে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম সরাসরি প্রভাব ফেলে না। এছাড়া আমদানিকারকদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পণ্য কিনলেও তা ভোক্তাদের কাছে সেই হারে পৌঁছায় না।

তিনি আরও বলেন, সীমিত সংখ্যক আমদানিকারকের নিয়ন্ত্রণে বাজার থাকায় এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যা প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে দাম কমার সুবিধা ভোক্তাদের কাছে না পৌঁছে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফায় পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমদানি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে বলে তিনি মত দেন।

শুধু চাল নয়, অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম এক বছরে প্রায় ১২ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে প্রায় ৯ শতাংশ দাম বাড়লেও দেশে বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমলেও দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

রসুনের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে রসুনের দাম প্রায় ৩২ শতাংশ কমলেও দেশীয় বাজারে দেশি রসুনের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যদিও আমদানি করা রসুনের দাম কিছুটা কমেছে। আদার ক্ষেত্রেও বিশ্ববাজারে মাত্র ৭ শতাংশ দাম বাড়লেও দেশে তা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।

টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা দ্রুত দেশের বাজারে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু দাম কমলে সেই সুবিধা ভোক্তারা পান না। এটি বাংলাদেশের বাজার কাঠামোর একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল আজহা উপলক্ষে মসলা জাতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে আমদানি যথাযথভাবে সমন্বয় হয়নি। ফলে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যেরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

টাস্কফোর্স বৈঠকে বাজার স্থিতিশীল রাখতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা প্রতিরোধ, মজুতদারি রোধে কঠোর ব্যবস্থা, এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব দেশেও পড়ছে। তবে সরকার বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, বাজারে কোনো পণ্যের সংকট নেই। বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ কিছুটা কম হলেও খোলা সয়াবিন পর্যাপ্ত রয়েছে। নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে দাম কমার পরও বাংলাদেশের বাজারে তার সুফল না পৌঁছানো একটি বড় নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর বাজার মনিটরিং, আমদানি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা কঠিন হবে। ফলে ভোক্তাদের স্বস্তি ফেরাতে এখন সমন্বিত ও কঠোর উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত