রাজস্ব ঘাটতি ৯ মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮ বার
রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ধস

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় চলমান সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ঘাটতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার সমান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্র জানায়, এই ঘাটতি গত অর্থবছরের পুরো সময়ের ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত অর্থবছরে মোট ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ঘাটতি বেড়ে গেছে আরও প্রায় পাঁচ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

তবে ঘাটতি বাড়লেও রাজস্ব আদায়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখিয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি সীমিত ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও বড় চিত্রে সংকট থেকেই যাচ্ছে।

রাজস্ব ঘাটতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে আয়কর খাতে। এই খাতে ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির সবচেয়ে বড় অংশ।

ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর খাতেও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা গেছে। এই খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, অথচ আদায় হয়েছে এক লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এখানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

কাস্টমস বা শুল্ক খাতেও পরিস্থিতি একই রকম। এই খাতে এক লাখ ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি হয়েছে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব ঘাটতির এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো, মনে করেন রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, করদাতারা যে পরিমাণ কর প্রদান করছেন, তা পুরোপুরি সরকারি কোষাগারে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় নতুন খাত খুঁজে বের করা এবং করজাল সম্প্রসারণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। উত্তরাধিকার সম্পত্তি কর ও সম্পদ করের মতো উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, যা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতে চাপ এবং কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া কিছু বড় করদাতার দেশত্যাগ এবং অর্থ পাচারের ঘটনাও রাজস্ব প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছর শুরু হবে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে, যা সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ছাড়া উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক খাতের ব্যয় টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে সরকারকে এখনই কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

সব মিলিয়ে রাজস্ব ঘাটতির এই চিত্র দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে না পারলে আগামী দিনে ঋণনির্ভর অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত