প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম বৃহৎ গবাদিপশুর সরবরাহ কেন্দ্র যশোরে কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন খামারিরা। জেলার ৮টি উপজেলার গ্রামীণ প্রান্ত থেকে শহরতলি পর্যন্ত বিস্তৃত খামারগুলো এখন ব্যস্ত সময় পার করছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায়। তবে প্রাণিসম্পদের এই সম্ভাবনাময় বাজারে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগও। কারণ, একদিকে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু প্রস্তুত হলেও অন্যদিকে বেড়ে যাওয়া উৎপাদন খরচ কাঙ্ক্ষিত লাভের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর যশোরে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়া। সংখ্যার দিক থেকে এটি স্থানীয় চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা প্রায় ১৫ হাজার পশু উদ্বৃত্ত রাখছে। ফলে জেলার বাইরে সরবরাহের সুযোগ থাকলেও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না খামারিদের মধ্যে।
যশোরের খামারগুলোতে এবার দেশি জাতের পাশাপাশি শাহিওয়াল, সিন্ধি ও ফ্রিজিয়ান জাতের বড় আকৃতির গরু লালন-পালন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা ইনজেকশন ছাড়াই প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে পশুগুলোকে বড় করা হয়েছে বলে দাবি খামারিদের। কাঁচা ঘাস, খড়, গমের ভুসি ও খৈল দিয়ে গরুগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে, যা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও স্বাস্থ্যবান।
তবে এই স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে পশু পালন করতে গিয়ে এবার খামারিদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গো-খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচ এবং শ্রমমূল্য বৃদ্ধির কারণে মোট উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। খামারিরা বলছেন, এক বছরের ব্যবধানে ভুসি ও খৈলের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় প্রতিটি পশুর পেছনে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যশোর সদর উপজেলার একজন অভিজ্ঞ খামারি মিলন হোসেন বলেন, তার খামারে বিভিন্ন জাতের ১২৫টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি গরু ঈদ উপলক্ষে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি জানান, সবচেয়ে বড় গরুর ওজন প্রায় ১৫ মণ পর্যন্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে যত্ন নিয়ে পশুগুলো বড় করা হলেও খরচের চাপ এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আশা করছেন, ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে বছরের পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হবে।
একইভাবে আরেক খামারি হাসানুজ্জামান জানান, তার খামারের পশুগুলোকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হয়েছে। সকালে গম ও ভুট্টার ভুসি, দুপুরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘাস এবং দিনে দুইবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। কোনো ধরনের কৃত্রিম হরমোন বা ওষুধ ব্যবহার না করেই পশুগুলো বড় করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিনি বলেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিটি পশুর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যা বাজারে বিক্রির সময় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সাইফুল ইসলাম নামে আরেক খামারি জানান, পশু লালন-পালনে তারা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করলেও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তার মতে, ভুসি, খৈলসহ প্রায় সব ধরনের পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বাজারে যদি প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া যায়, তাহলে অনেক খামারি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান বলেন, খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা নিরাপদ ও লাভজনকভাবে পশু পালন করতে পারেন। তিনি জানান, চলতি বছর যশোরে উৎপাদিত গবাদিপশুর সংখ্যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় জেলার বাইরেও সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। এতে খামারিরা তুলনামূলক ভালো বাজার পেতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, গো-খাদ্যের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কাঁচা ঘাস ব্যবহার করে খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সরকারিভাবে খামারিদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যশোর দেশের গবাদিপশু সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে উৎপাদিত পশু শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে খামারিদের মুনাফার মার্জিন কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ভোক্তাদের জন্য বিষয়টি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও বাজারের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কারণ উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে খামার শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে যশোরের কোরবানির পশুর বাজার এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিপুল পরিমাণ পশু প্রস্তুত, অন্যদিকে খরচের চাপে উদ্বেগে খামারিরা। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই বাজারে আশা ও অনিশ্চয়তার দোলাচল স্পষ্ট হয়ে উঠছে।