টানা দুই দফায় আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬
  • ৩৭ বার
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশ বাজার পরিবর্তন বাজুস

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। একটানা দুই দফায় মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী—সবাইকে নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য করছে। সর্বশেষ সমন্বয়ে ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানোর ফলে বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের কাছাকাছি উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) বৃহস্পতিবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন মূল্য ঘোষণা করে, যা একই দিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। সংগঠনটি জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্যবৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের দামের ওঠানামা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝোঁক—সব মিলিয়ে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও।

নতুন নির্ধারিত দামে দেশের বাজারে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা। একইভাবে ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২১৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা।

এর আগে মাত্র একদিন আগেই, অর্থাৎ ৬ মে সকালে, বাজুস আরেক দফা মূল্য সমন্বয় করেছিল। সেই সমন্বয়ে ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ, দুই দিনের ব্যবধানে দুই দফা মূল্যবৃদ্ধিতে স্বর্ণের বাজারে মোট ৪ হাজার টাকারও বেশি বৃদ্ধি ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয় বৃদ্ধির প্রবণতা—সব মিলিয়ে স্বর্ণকে একটি “নিরাপদ বিনিয়োগ” হিসেবে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি হওয়ায় তার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজারে গত কয়েক বছর ধরেই ঘন ঘন মূল্য সমন্বয়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৬৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ বার দাম বেড়েছে এবং ২৮ বার কমেছে। ২০২৫ সালেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে মোট ৯৩ বার মূল্য সমন্বয় করা হয়। তার মধ্যে ৬৪ বার দাম বৃদ্ধি এবং ২৯ বার হ্রাস করা হয়েছিল। এই ঘন ঘন পরিবর্তন বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে বলে মনে করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বিভিন্ন স্বর্ণালঙ্কার দোকান মালিকরা বলছেন, দাম বাড়ার কারণে ক্রেতাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এখন স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। অনেকেই বিয়ের মৌসুমেও আগের তুলনায় কম স্বর্ণ কিনছেন বা বিকল্প হিসেবে কম ক্যারেটের স্বর্ণ বেছে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে রুপার বাজারেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ সমন্বয়ে ভরিতে ১১৭ টাকা বেড়ে ২২ ক্যারেট রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৭৪ টাকা। ২১ ক্যারেট রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫৪০ টাকায়, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৭২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ৩ হাজার ৫৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজুস জানিয়েছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রুপার দাম ৩৮ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১ বার বৃদ্ধি এবং ১৭ বার হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ১৩ বার সমন্বয়ের মধ্যে ১০ বার দাম বেড়েছিল এবং মাত্র ৩ বার কমেছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে, রুপার বাজারেও স্থিতিশীলতা এখনো ফিরে আসেনি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ ও রুপার বাজারে এই ধরনের ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। বিশেষ করে যারা স্বর্ণকে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় বা পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রাখেন, তাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

তারা আরও মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দেশের স্বর্ণবাজারকে আরও সুসংগঠিত ও পূর্বাভাসযোগ্য করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন শুধু ক্রেতাদের নয়, পুরো খুচরা বাজার ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে সময় এবং বাজার বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অস্থির বাজারে হঠাৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করলে কিছুটা হলেও ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের স্বর্ণ ও রুপার বাজার বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, ডলারের বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে বাজার স্থিতিশীল হবে, নাকি আরও পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে—সেই প্রশ্ন এখন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত