হান্টা ভাইরাস আতঙ্কে ডাচ বন্দরে বিলাসবহুল জাহাজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
হান্টা ভাইরাস আতঙ্কে ডাচ বন্দরে বিলাসবহুল জাহাজ

প্রকাশ: ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব যখন করোনা মহামারির ভয়াবহ স্মৃতি পুরোপুরি ভুলতে পারেনি, ঠিক সেই সময় আবারও একটি ভাইরাসকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হান্টা ভাইরাসে আক্রান্ত যাত্রী বহনকারী ডাচ পতাকাবাহী বিলাসবহুল প্রমোদতরি ‘এমভি হন্ডিয়াস’কে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সতর্কতা। সোমবার (১৮ মে) সকালে জাহাজটি নেদারল্যান্ডসের ব্যস্ততম বন্দর নগরী Rotterdam-এ নোঙর করার কথা রয়েছে। এর আগেই ডাচ কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে জীবাণুমুক্ত করা, নাবিকদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া এবং সম্ভাব্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

ডাচ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটিতে থাকা ২৫ জন নাবিক এবং দুইজন চিকিৎসাকর্মীর জন্য বিশেষ কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডাচ নাগরিকদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য তদারকি থাকলেও বিদেশি ক্রুদের জন্য বিশেষ কোয়ারেন্টাইন সুবিধা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণ ৪২ দিনের কোয়ারেন্টাইন তারা সম্পন্ন করবেন কিনা, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিলাসবহুল প্রমোদতরি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ যাত্রা শুরু করেছিল ২৩টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও নাবিক নিয়ে। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও গত ২ মে কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও জ্বরের উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করলে বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় কয়েকজনের শরীরে হান্টা ভাইরাস শনাক্ত হয়।

এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক ডাচ দম্পতি এবং একজন জার্মান নাগরিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মে পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। এর মধ্যে আটজনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও দুজনকে সম্ভাব্য আক্রান্ত হিসেবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

তবে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকার শনিবার (১৬ মে) জানায়, জাহাজটির এক কানাডীয় যাত্রীর শরীরেও হান্টা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১১ জনে। ফলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নজর এখন পুরোপুরি এই জাহাজ ও এর যাত্রীদের ওপর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হান্টা ভাইরাস নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এটি মূলত ইঁদুর বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত প্রাণীর মল, প্রস্রাব বা লালার সংস্পর্শে এলে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মধ্যে সরাসরি এই ভাইরাস ছড়ানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আর এমন সংক্রমণের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা প্রয়োজন হয়।

এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, হান্টা ভাইরাসকে কোভিড-১৯ এর সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ করোনাভাইরাসের মতো এটি বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক ভাইরাস নয়। তবুও উদ্বেগের কারণ রয়েছে, কারণ এর সুপ্তিকাল প্রায় ছয় সপ্তাহ বা ৪২ দিন পর্যন্ত হতে পারে। ফলে কেউ আক্রান্ত হলেও দীর্ঘ সময় উপসর্গহীন থাকতে পারেন। এতে নতুন আক্রান্তদের শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাহাজটি রটারডামে পৌঁছানোর খবর প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ আতঙ্কিত, কেউ আবার পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। ৩৫ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ক্লডিয়া এদুয়ার্দো সংবাদমাধ্যমকে বলেন, করোনা মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ এখন স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতন হলেও অনেকেই এখনও নিয়ম মানতে অনীহা দেখায়। তাই কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সী তরুণ আলেক্স ম্লাদেনোভিচ জানিয়েছেন, প্রথমে তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পরে বিভিন্ন স্বাস্থ্য তথ্য পড়ে বুঝতে পারেন যে হান্টা ভাইরাস বহু পুরোনো এবং সীমিত সংক্রমণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ভাইরাস। তাই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে নেদারল্যান্ডস সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। জাহাজে থাকা প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিশেষ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজটিকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করার কাজও শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বায়নের এই যুগে একটি জাহাজ, বিমান বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সহজেই কোনো সংক্রমণকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে দিতে পারে। তাই সংক্রমণ সীমিত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে কঠোর নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব ভাইরাসের সুপ্তিকাল দীর্ঘ, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংক্রমণ শনাক্তে বিলম্ব হতে পারে।

করোনা মহামারির পর বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে। হান্টা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সেই প্রস্তুতিরই একটি বাস্তব পরীক্ষা দেখছে ইউরোপ। ডাচ কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপাতত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, উচ্চ-ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ৪২ দিনের কোয়ারেন্টাইন এবং কম-ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত শারীরিক পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা যাত্রীদের বহনকারী একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরি কীভাবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলো, এমভি হন্ডিয়াসের ঘটনাটি এখন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত