প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধাবস্থার শঙ্কা তৈরি হতেই কেঁপে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি। জ্বালানি তেলের দামে আকস্মিক উল্লম্ফন, বন্ড বাজারে অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কের প্রভাবে সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধরনের ধস নেমেছে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব।
সোমবার (১৮ মে) লেনদেন শুরু হওয়ার পরপরই এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দরপতন দেখা যায়। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাবে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ফান্ড ম্যানেজাররা।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে United Arab Emirates-এর একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনার পর। হামলায় সেখানে আগুন লাগার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে Saudi Arabia দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা তীব্র ছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন Donald Trump ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় আসার কড়া হুঁশিয়ারি দেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ঘিরে। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ Strait of Hormuz এখন কার্যত অচল অবস্থার মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের সংকট সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিগুলো জ্বালানি সংকটে পড়বে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মজুদ দ্রুত কমতে শুরু করেছে। বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক ও গবেষণা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুনের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যদি চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এই সংকট অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৭ সালের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন বা বিদ্যুৎ খাত নয়, প্রায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। বিশেষ করে ইউরোপ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্যপণ্য, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে United Kingdom এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও সুদের হার বাড়ানোর দিকে যেতে বাধ্য হবে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই সোমবার G7 Finance Ministers Meeting-এ জি-৭ দেশের অর্থমন্ত্রীরা জরুরি বৈঠকে বসছেন। Paris-এ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক বাজার স্থিতিশীল রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জ্বালানি ব্যয়ের চাপ শুধু শেয়ারবাজারেই নয়, বন্ড বাজারেও তীব্র প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন আশঙ্কা করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আরও বাড়াতে পারে। এর ফলে সরকারি বন্ডের ইল্ড দ্রুত বাড়ছে।
মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৬৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে Japan-এর সরকারি বন্ডের সুদও ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিশ্ব অর্থনীতি আবারও উচ্চ সুদ ও কম প্রবৃদ্ধির কঠিন চক্রে প্রবেশ করতে পারে।
শেয়ারবাজারের পরিস্থিতিও ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। সোমবার জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক নিক্কেই ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়। South Korea-এর প্রধান সূচকও নিম্নমুখী ছিল। শুধু এশিয়াই নয়, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার, নাসডাক ফিউচার এবং ইউরোপের ইউরোস্টক্স ফিউচার সবকটিই লাল সংকেতে নেমে আসে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে স্বর্ণ, সরকারি বন্ড এবং ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এতে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই প্রযুক্তি খাতের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ববাজার। চলতি সপ্তাহে NVIDIA তাদের আয় প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা এখনও কতটা শক্তিশালী রয়েছে, সেই ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে এই প্রতিবেদনে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান Walmart-এর আয় প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় আচরণে পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটির প্রতিফলন পাওয়া যাবে এই প্রতিবেদনে।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগ হলো—মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট যদি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তাহলে সেটি শুধু তেলের বাজার নয়, পুরো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সুদের হার বৃদ্ধির সমন্বয়ে নতুন ধরনের বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এখন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষ সবার নজর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে। কারণ কয়েকটি ড্রোন হামলা থেকে শুরু হওয়া এই সংকট শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা গভীর অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।