প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে মানবিক সংকট নতুন কিছু নয়। তবে সেই সংকট যখন প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিস্তারের সঙ্গে মিশে যায়, তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঠিক এমন এক সংকটের মুখোমুখি এখন Democratic Republic of the Congo। দেশটির সংঘাতপূর্ণ পূর্বাঞ্চলে বিরল প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস ইতোমধ্যে শত শত মানুষকে আক্রান্ত করেছে এবং বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আঞ্চলিক স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে অন্তত ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশের মৃত্যু হওয়ায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ভাইরাসটির ধরন বিরল হওয়ায় এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ব আবারও কোভিড-১৯ এর মতো বৈশ্বিক মহামারির দিকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইবোলা অত্যন্ত প্রাণঘাতী হলেও এটি করোনাভাইরাসের মতো সহজে বাতাসে ছড়ায় না। ফলে বৈশ্বিক সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
তবুও উদ্বেগের বড় কারণ রয়েছে। কঙ্গোর সীমান্তবর্তী Uganda, South Sudan এবং Rwanda-কে উচ্চ ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। কারণ আক্রান্ত এলাকার মানুষ জীবিকা, ব্যবসা ও নিরাপত্তার কারণে নিয়মিত সীমান্ত পারাপার করে থাকে। এতে ভাইরাস সীমান্ত অতিক্রম করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ডক্টর আমান্ডা রোজিক জানিয়েছেন, কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে চলমান সংঘাত, অন্যদিকে দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা—দুইয়ের সমন্বয়ে ভাইরাস মোকাবিলার কাজ কঠিন হয়ে উঠেছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এবার কঙ্গোয় যে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে সেটি ইবোলার তুলনামূলকভাবে বিরল ‘বান্ডিবুগিও’ প্রজাতি। অতীতে ২০০৭ এবং ২০১২ সালে এই প্রজাতির সংক্রমণ দেখা গিয়েছিল। তখন আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও মৃত্যুহার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো টিকা নেই। এমনকি দ্রুত শনাক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাও সীমিত। কঙ্গোর স্থানীয় ল্যাবগুলোতে প্রাথমিক পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসার পর উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এতে প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ এপ্রিল একজন নার্সের শরীরে প্রথম ইবোলার লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লেগে যায়। এই বিলম্বকে ভয়াবহ ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
Imperial College London-এর গবেষক ডক্টর অ্যান কোরি বলেছেন, প্রাদুর্ভাব শনাক্তে দেরি হওয়ায় ভাইরাসটি এরইমধ্যে আরও অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার মতে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যে অঞ্চলে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত। সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছে। স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সংকট সেখানে আগে থেকেই ছিল। তার ওপর নতুন করে ইবোলার প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আক্রান্ত এলাকার বেশিরভাগ অঞ্চল খনি-নির্ভর শহর হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে যাতায়াত করে। এই চলাচল ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত সীমান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা করার ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তবে আশার কথাও রয়েছে। London School of Hygiene & Tropical Medicine-এর গবেষক ডক্টর ড্যানিয়েলা মানো বলেছেন, ইবোলা মোকাবিলায় কঙ্গোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত এক দশকে দেশটি একাধিক ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করেছে। ফলে আগের তুলনায় তাদের চিকিৎসা অবকাঠামো ও রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি উন্নত।
ইবোলা ভাইরাস সাধারণত ফলভোজী বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায় বলে ধারণা করা হয়। আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি বা শরীরের অন্যান্য তরল পদার্থের মাধ্যমে এটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
শুরুর দিকে রোগীর জ্বর, মাথাব্যথা, গা ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। পরে বমি, ডায়রিয়া, কিডনি ও লিভারের জটিলতা এবং ভয়াবহ রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে আক্রান্তদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকায় চিকিৎসকেরা মূলত উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। শরীরে পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এখন কঙ্গোতে জরুরি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। চিকিৎসক, পরীক্ষাগার সরঞ্জাম এবং মোবাইল স্বাস্থ্য ইউনিট পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী দেশগুলোতেও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনও বৈশ্বিক আতঙ্কের পর্যায়ে না পৌঁছালেও এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ সংঘাত, দারিদ্র্য ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের আলাদা রাখা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা।