প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাত তখন গভীর। চারদিকে নীরবতা। হঠাৎ করেই ভেসে আসে একের পর এক গুলির শব্দ। আতঙ্কে ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি স্থানীয় বাসিন্দারা। কিছুক্ষণ পর যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন একটি বাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল রক্তাক্ত দেহ। কেউ মেঝেতে, কেউ দরজার পাশে, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন ঘরের কোণে। ভয়াবহ সেই দৃশ্য এখন নাড়া দিয়েছে পুরো Mexico-কে।
দেশটির Puebla রাজ্যের তেহুইৎসিঙ্গো শহরে সশস্ত্র হামলায় এক শিশুসহ অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে মেক্সিকোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বিশেষ করে আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশটির আইনশৃঙ্খলা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজ্য সরকার সোমবার (১৮ মে) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, তিনজন নারী এবং একজন নাবালক রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই নিহতদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার (১৭ মে) ভোররাত প্রায় পৌনে ২টার দিকে এলাকাবাসী হঠাৎ বিকট গুলির শব্দ শুনতে পান। প্রথমে অনেকে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভেবে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু গুলির শব্দ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
পরে এক স্থানীয় বাসিন্দা জরুরি নম্বরে ফোন করে পুলিশের কাছে সাহায্য চান। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির ভেতরে একাধিক ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পথেই এক নারীর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা পরে অন্যদেরও মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়ে পড়েন উদ্ধারকারীরা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনায় উঠে এসেছে, হামলাকারীরা অত্যন্ত কাছ থেকে নির্বিচারে গুলি চালায়। দেয়াল, দরজা ও আসবাবপত্রে অসংখ্য গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবেই বাড়িটিকে টার্গেট করেছিল।
তবে এখন পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য কিংবা এর পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারীরা। সোমবার সকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
মেক্সিকো দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কার্টেলভিত্তিক সহিংসতার জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী অপরাধচক্রগুলোর আধিপত্য বিস্তার, মাদক পাচার এবং প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং অপরাধচক্রের মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ বহু বছর ধরেই দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহুইৎসিঙ্গোর এই হামলাও হয়তো সেই বৃহত্তর সহিংসতারই অংশ। যদিও কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কার্টেলের নাম উল্লেখ করেনি, তবুও ঘটনাটিকে ঘিরে মাদকচক্র সংশ্লিষ্ট সহিংসতার আশঙ্কাই বেশি দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুখ্যাত Jalisco New Generation Cartel-এর শীর্ষ নেতা নেমেসিও ‘এল মেনচো’ ওসেগুয়েরা নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে নতুন করে সহিংসতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন কার্টেলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধের লড়াই আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বিশ্বকাপ আয়োজনকে কেন্দ্র করে মেক্সিকোর নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফুটবল বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটক, খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে মেক্সিকোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেশী United States-এর চাপও বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর প্রশাসন সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে মাদক কার্টেল দমনে মেক্সিকোর ভেতরে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট Claudia Sheinbaum স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পদক্ষেপ মেক্সিকোর সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদক কার্টেল ইস্যু এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক পাচার এবং অভিবাসন—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সম্পর্ক এখন নতুন এক চাপে রয়েছে।
অলাভজনক গবেষণা সংস্থা InSight Crime-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মেক্সিকোতে হত্যাকাণ্ডের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। সরকার এই তথ্যকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। কারণ দেশটিতে মানুষ নিখোঁজ হওয়ার হারও অনেক বেশি। ফলে সব হত্যাকাণ্ড সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হচ্ছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক পরিবার এখনও তাদের স্বজনদের খুঁজে পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে। গুম, অপহরণ এবং অজ্ঞাত লাশের ঘটনা মেক্সিকোর বহু অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তেহুইৎসিঙ্গোর এই হত্যাকাণ্ড সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একটি শিশুর মৃত্যু দেশজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাধারণ মানুষ এখন ঘরের ভেতরেও নিরাপদ বোধ করছেন না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র সামরিক অভিযান বা পুলিশি তৎপরতা দিয়ে এই সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া সহিংসতা কমানো কঠিন হবে।
এখন পুরো মেক্সিকো তাকিয়ে আছে তদন্তের দিকে। কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং কেন একটি বাড়িকে রক্তাক্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা হলো—সেই উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিহতদের স্বজন এবং আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।