ধান উড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দম্পতির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
ধান উড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দম্পতির

প্রকাশ: ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভোরের আলো তখন ঠিকমতো ফোটেনি। গ্রামের মানুষ কেউ মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউবা উঠোনে দিনের কাজ শুরু করেছেন। এমনই এক সাধারণ সকালে ঝিনাইদহের একটি পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। সংসারের নিত্যদিনের কাজ করতে গিয়েই মুহূর্তের মধ্যে নিভে যায় স্বামী-স্ত্রীর জীবন। বৈদ্যুতিক পাখায় ধান উড়ানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একসঙ্গে মারা গেছেন বৃদ্ধ দম্পতি। মর্মান্তিক এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।

ঘটনাটি ঘটেছে Jhenaidah Sadar Upazila উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের গাগান্না গ্রামে। নিহতরা হলেন ওই গ্রামের বাসিন্দা মজিবর খাঁ (৬০) এবং তার স্ত্রী মোমেনা খাতুন (৫৫)। দীর্ঘদিন ধরে তারা গ্রামের বাড়িতেই কৃষিকাজ ও সংসার সামলে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু সোমবার (১৮ মে) ভোরে একটি দুর্ঘটনা তাদের জীবনের সবকিছু শেষ করে দেয়।

স্বজন ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাড়ির কাজ শুরু করেছিলেন মজিবর খাঁ। নতুন কাটা ধান পরিষ্কার করার জন্য বৈদ্যুতিক পাখা দিয়ে ধান উড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। গ্রামবাংলায় ধান থেকে খোসা ও ময়লা আলাদা করতে এভাবে পাখা ব্যবহার করা অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত পদ্ধতি।

সকালে তিনি বাড়ির উঠোনে পাখাটি চালু করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরও পাখাটি চলছিল না। তখন সেটি পরীক্ষা করতে এগিয়ে যান তিনি। পরিবারের সদস্যরা জানান, পাখাটির কোথাও বিদ্যুতের তার ছেঁড়া ছিল অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেটি পরীক্ষা করার সময় হঠাৎ করেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন মজিবর খাঁ।

বিদ্যুতের তীব্র আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং পাখাটি তার বুকের ওপর পড়ে থাকে। পুরো ঘটনাটি ঘটে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। পাশে থাকা স্ত্রী মোমেনা খাতুন স্বামীকে ওই অবস্থায় দেখে ছুটে যান তাকে বাঁচাতে। কিন্তু না বুঝেই তিনি স্পর্শ করেন বিদ্যুতায়িত অংশ। সঙ্গে সঙ্গেই তিনিও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন।

স্থানীয়রা জানান, তখন বাড়ির আশপাশে খুব বেশি মানুষ ছিল না। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে দেখতে পান স্বামী-স্ত্রী দুজনই নিথর হয়ে পড়ে আছেন। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ততক্ষণে দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে।

একই পরিবারের দুই সদস্যের এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো গাগান্না গ্রামে শোকের মাতম নেমে আসে। প্রতিবেশীরা জানান, মজিবর খাঁ ও মোমেনা খাতুন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী মানুষ। তাদের সংসার ছিল সাধারণ, কিন্তু সুখী। একে অপরের প্রতি ছিল গভীর মমতা। সেই মমতার টানেই স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনও হারান মোমেনা খাতুন।

স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতাও তুলে ধরেছে। অনেক গ্রামে এখনও পুরোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ এবং নিরাপত্তাহীন ব্যবস্থার মধ্যেই মানুষ প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছে। সচেতনতার অভাব ও নিয়মিত বৈদ্যুতিক পরীক্ষা না হওয়ার কারণেও এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, ধান উড়ানোর জন্য ব্যবহৃত পাখাটি অনেক পুরোনো ছিল। সেটিতে আগে থেকেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল পরিবারটি।

ঘটনার পর এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বাড়ি। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

স্থানীয়রা আরও জানান, মজিবর খাঁ ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বয়স বাড়লেও তিনি এখনও নিয়মিত কৃষিকাজ করতেন। অন্যদিকে মোমেনা খাতুন সংসারের সব দায়িত্ব সামলাতেন। তাদের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

এ বিষয়ে Jhenaidah Sadar Police Station-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, হলিধানী ইউনিয়নের গাগান্না গ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ সংযোগ, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের আগে নিয়মিত পরীক্ষা, তার ও সংযোগ নিরাপদ রাখা এবং ভেজা হাতে কোনো যন্ত্র স্পর্শ না করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তারা আরও বলছেন, অনেক সময় মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাও ঝুঁকিতে পড়েন। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরাসরি স্পর্শ না করে প্রথমে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গাগান্না গ্রামের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল, সামান্য অসাবধানতা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একটি পরিবারের দুই মানুষ মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার এই বেদনা এখন পুরো গ্রামের মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত