গুম ও মানবাধিকার আইনে আসছে বড় পরিবর্তন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ১২ বার
গুম ও মানবাধিকার আইনে আসছে বড় পরিবর্তন

প্রকাশ: ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারহীনতার অভিযোগ বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গুমের ঘটনা, তদন্তের সীমাবদ্ধতা এবং মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার বড় ধরনের আইনি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সরকার জানিয়েছে, ‌‌‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ থাকা বিভিন্ন অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা দূর করতেই নতুন আইন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

রোববার (১৭ মে) রাজধানীর CIRDAP Auditorium মিলনায়তনে এ দুটি খসড়া আইন নিয়ে মতবিনিময় ও অংশীজন সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মো. আসাদুজ্জামান। সভায় অংশ নেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, United Nations Development Programme-এর আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার এবং গুমের শিকার সাবেক সংসদ সদস্য M. Ilias Ali-এর সহধর্মিণী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী। এছাড়াও মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা সভায় মতামত তুলে ধরেন।

সভায় নতুন আইনের খসড়া নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উদ্বেগ উঠে আসে। অংশীজনদের অনেকেই গুম তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান। তাদের বক্তব্য, কোনো বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা কার্যকরভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সেই একই বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে। বক্তারা বলেন, এতে নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেউ কেউ প্রস্তাব করেন, আইন দুটি চূড়ান্ত করার আগে আরও বিস্তৃত গণশুনানি আয়োজন করা উচিত, যাতে ভুক্তভোগী পরিবার ও নাগরিক সমাজের মতামত আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।

সভায় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, কমিশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের নিজের হাতেই রাখতে হবে। অন্যথায় এটি আবারও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে বেশ কিছু আইনি দুর্বলতা ছিল। নতুন খসড়ায় গুমকে সরাসরি একটি ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ বা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে গুমের অভিযোগ শুধু মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নিয়মিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আওতায় এনে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

নতুন খসড়ায় শাস্তির বিধানও আগের তুলনায় কঠোর করা হয়েছে। আগের অধ্যাদেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ‘অনধিক ১০ বছর’ সাজা দেওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে বিচারক চাইলে তুলনামূলক কম শাস্তিও দিতে পারতেন। নতুন আইনে ন্যূনতম ১০ বছরের কারাদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে অপরাধের গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করছে সরকার।

খসড়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশ মামলা করতে পারবেন। এছাড়া তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং বিচার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট আদালতকে Supreme Court of Bangladesh-এ লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

নতুন খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা অখণ্ডতার অজুহাতে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া যাবে না। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ধারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে গুমের ঘটনা কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তাহসিনা রুশদী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশ থেকে গুমকে চিরতরে বিদায় করতে হবে। তিনি বলেন, এমন আইন প্রয়োজন যা শুধু ভবিষ্যতের গুম ঠেকাবে না, অতীতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের বিচারও নিশ্চিত করবে।

তিনি তার স্বামী এম ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারগুলো এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির খবর পায়নি। তার ভাষায়, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা শুধু বিচার নয়, সত্য জানারও অধিকার রাখেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার আর একটি গুমও দেখতে চায় না। একই সঙ্গে সরকার একটি ‘নখদন্তহীন’ মানবাধিকার কমিশনও চায় না। অতীতে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, নতুন আইনে প্রতিটি স্তরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কমিশনের কার্যকারিতা বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে শুধু প্রতীকী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা হবে না; বরং এটি যেন বাস্তবিক অর্থে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, সে লক্ষ্যেই নতুন আইন আনা হচ্ছে। বাজেট অধিবেশনের পর সংসদে আইন দুটি পাস হতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইনগুলোর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। কারণ অতীতেও অনেক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবুও গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন এবং মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত