রিজার্ভ চুরির মামলা ৯৫তম বার পেছাল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
রিজার্ভ চুরির মামলা ৯৫তম বার পেছাল

প্রকাশ: ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আবারও পিছিয়েছে। এ নিয়ে টানা ৯৫তম বার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হলো। নতুন তারিখ হিসেবে আগামী ২ জুলাই নির্ধারণ করেছেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলমান এই মামলার অগ্রগতি না হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ও তদন্ত সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সোমবার (১৮ মে) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে এদিন মামলার তদন্ত সংস্থা Criminal Investigation Department প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়। পরে আদালত পরবর্তী তারিখ হিসেবে ২ জুলাই নির্ধারণ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান।

এই মামলাটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট কোড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের বড় একটি অংশ চুরি হয়। মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বিভিন্ন ভুয়া ট্রান্সফারের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়, যা পরবর্তীতে ফিলিপাইনে গিয়ে পৌঁছায়।

ঘটনার পর তদন্তে জানা যায়, চুরি হওয়া অর্থ ফিলিপাইনের স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে কয়েকটি ক্যাসিনোতে পাচার করা হয়। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

পরে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় দায়ের করা এই মামলায় শুরুতে সরাসরি কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি, যা তদন্তের জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

তদন্তের দায়িত্ব পায় Criminal Investigation Department। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও একাধিক দফায় সময় নেওয়া সত্ত্বেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে মামলাটি কার্যত দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করছেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ ফিলিপাইনের একটি ক্যাসিনো থেকে উদ্ধার করে দেশটির সরকার বাংলাদেশকে ফেরত দেয়। তবে প্রায় ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এই ঘটনায় অর্থ উদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইও চালিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে একটি মামলা করা হয়, যাতে অর্থ ফেরতের চেষ্টা করা হয়। তবে পরবর্তীতে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়, কারণ সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারিক এখতিয়ার নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত র‍্যাডিয়েন্ট কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি)-এর বিরুদ্ধে মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ওই আদালতের এই মামলার বিচারিক ক্ষমতা নেই। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে এখতিয়ারভুক্ত আদালতে মামলা করার উদ্যোগ নেয় বলে জানানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিজার্ভ চুরির মতো জটিল আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের তদন্তে সময় লাগা স্বাভাবিক হলেও ৯৫ বার তারিখ পিছিয়ে যাওয়াকে বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এতে মামলার ভবিষ্যৎ অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, এই ঘটনা শুধু একটি আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতারও প্রতিফলন। তারা বলছেন, এ ধরনের বড় ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

অন্যদিকে আইনজীবীরা মনে করছেন, তদন্ত সংস্থার ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং দীর্ঘসূত্রতা বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত সম্পন্ন করা না গেলে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, রিজার্ভ চুরির মামলার ৯৫তম বার প্রতিবেদন পেছানোর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে রয়েছে হারানো অর্থ উদ্ধারের অসমাপ্ত লড়াই, অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা—দুই মিলিয়ে মামলাটি এখনো একটি বড় জাতীয় ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত