তাইওয়ান আবারও বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন থেকে বাদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
তাইওয়ান আবারও বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন থেকে বাদ

প্রকাশ: ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তাইওয়ান। টানা দশম বছরের মতো দেশটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন (WHA) থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। চীনের রাজনৈতিক চাপ ও ‘এক চীন’ নীতির প্রভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তাইপে প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। এই ঘটনাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা World Health Assembly-এর ৭৯তম অধিবেশন এবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলনকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি, রোগ প্রতিরোধ কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এবারও সেখানে অংশগ্রহণের জন্য কোনো আমন্ত্রণ পায়নি Taiwan।

তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং অভিযোগ করেছেন, ধারাবাহিকভাবে এই সম্মেলন থেকে বাদ পড়ার পেছনে মূল কারণ হলো চীনের রাজনৈতিক প্রভাব। তার মতে, স্বাস্থ্য একটি বৈশ্বিক মানবিক ইস্যু হলেও সেটিকে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে ক্ষতিকর। তিনি আরও বলেন, তাইওয়ানের অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিশ্বব্যাপী রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত, কিন্তু রাজনৈতিক বাধার কারণে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

দ্য তাইপেই টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়ে টানা দশ বছর তাইওয়ান বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, World Health Organization-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চীনের অবস্থান অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তাইওয়ানের অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বেইজিংয়ের ‘এক চীন’ নীতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে China-এর কূটনৈতিক অবস্থান। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বেইজিং তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসবে না এবং তাইওয়ানকে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় আলাদা অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার কারণ হয়ে আছে।

তাইওয়ানের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমে তাদের অন্তর্ভুক্তি না থাকা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে। কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী সময়ে এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের উন্নত ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই ইস্যুতে মতভেদ রয়েছে। কিছু পশ্চিমা দেশ মনে করে, স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা উচিত। একই সঙ্গে United States একাধিকবার তাইওয়ানের অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, তাইওয়ানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তিত অবস্থানের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এক সময় World Health Organization থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তিনি সংস্থাটির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, অদক্ষতা এবং চীনের প্রভাবাধীন হয়ে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারি ব্যবস্থাপনায় সংস্থাটির ভূমিকা ছিল ব্যর্থ।

সংস্থাটির মহাপরিচালক Tedros Adhanom Ghebreyesus-এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সমালোচনা ওঠে, বিশেষ করে মহামারি ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে। এসব বিতর্কের ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্ন আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। European Union-এর এক মুখপাত্র বলেছেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও কাঠামো যতটা অনুমতি দেয়, ততটা পর্যন্ত তাইওয়ানকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাদের মতে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়ে সহযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু তাইওয়ানের অংশগ্রহণের প্রশ্ন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একটি বড় অংশ মনে করে, মহামারি-পরবর্তী বিশ্বে স্বাস্থ্য সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতায় কোনো দেশকে বাদ দেওয়া মানে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও দুর্বল করা। কারণ সংক্রামক রোগ কোনো সীমানা মানে না, এবং একটি অঞ্চলের তথ্য ও অভিজ্ঞতা অন্য অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, টানা দশ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন থেকে তাইওয়ানের বাদ পড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি এবং কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি জটিল চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান, অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক অবস্থান ও শক্তির দ্বন্দ্ব। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত