প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি আবারও বড় আকারে সামনে এসেছে। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র, যেখানে বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে দেখানো বন্ধকি সম্পত্তির বড় অংশই বাস্তবে অস্তিত্বহীন বা অত্যন্ত কম মূল্যবান। ফলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্পদমান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান দিয়ে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ও বন্ধকি সম্পদের আর্থিক মূল্যায়ন করায়। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বাস্তব বাজারমূল্যে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের মাত্র ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশই বাস্তব সম্পদ দ্বারা আচ্ছাদিত। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফোর্স সেল ভ্যালু বা জরুরি অবস্থায় দ্রুত বিক্রয়যোগ্য মূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে বন্ধকি সম্পদের এই ধরনের বড় ব্যবধান সাধারণত গুরুতর ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। কারণ ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে ৫০ থেকে ৮০ টাকার মতো বাস্তবসম্মত সম্পদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অনেক ঋণের বিপরীতে ঘোষিত সম্পদ বাস্তবে নেই বা মূল্য অত্যন্ত কম।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে যে সম্পত্তি বন্ধকি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সম্পদ দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্বল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এই তিন ব্যাংকের ক্ষেত্রে বন্ধকি সম্পদের বড় অংশের অস্তিত্ব না পাওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও সামগ্রিকভাবে তারা এখনো উচ্চ ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, এসব ব্যাংকের বড় অংশের ঋণ এখন বেনামি বা অচিহ্নিত অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক ঋণগ্রহীতা পলাতক থাকায় সেগুলো আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নতুন করে বন্ধকি সম্পদ জব্দ বা বিক্রি করেও ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব দুর্বল সম্পদ বা অনাদায়ী ঋণ একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হবে।
এদিকে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে মোট ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আরও ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্তই ফেরত পাচ্ছেন, তার আমানত যত বেশি হোক না কেন। বাকি অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব সম্পদ থেকে নয়, বরং বিশেষ তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর দায় কিছুটা কমছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে এপ্রিল শেষে ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির আমানত কমে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ৫৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে এবং সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আংশিকভাবে সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হয়ে পরে আবার বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
চার মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশই খেলাপি ছিল। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণের মান উন্নত হওয়ার বদলে আরও খারাপ হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২২টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতিই ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো খাতের অর্ধেকেরও বেশি চাপ এই পাঁচ ব্যাংকের ওপর।
এক্সিম ব্যাংকের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। ব্যাংকটির ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ খেলাপি, যা প্রায় সম্পূর্ণ অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার ঋণের ৯৬ শতাংশের বেশি খেলাপি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ শতাংশেরও বেশি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭৬ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং যথাযথ তদারকির অভাবই এই সংকটকে গভীর করেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পুনর্গঠন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা পুরো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ আমানতকারীদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়।