শহীদ মিনারে অশ্রুসিক্ত বিদায় কারিনা কায়সারের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
শহীদ মিনারে অশ্রুসিক্ত বিদায় কারিনা কায়সারের

প্রকাশ:  ১৮ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রোববার রাতে পরিণত হয় এক গভীর শোক ও আবেগঘন বিদায়ের মঞ্চে। অল্প বয়সে প্রয়াত কারিনা কায়সারকে শেষ বিদায় জানাতে সেখানে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, সাংস্কৃতিক মহল—সব জায়গার পরিচিত মুখদের উপস্থিতিতে শহীদ মিনারের পরিবেশ হয়ে ওঠে ভারী ও নীরব শোকের। চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতিচারণায় বিদায়ের মুহূর্তটি হয়ে ওঠে হৃদয়বিদারক।

রোববার রাত সোয়া দশটার দিকে শহীদ মিনারের বেদিতে কারিনা কায়সারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শতাধিক মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল নীরবতা, মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ। অনেকেই জানাজার সময় অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

জানাজায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ একাধিক শিক্ষক। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, এ বি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ আহসান এবং সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারসহ আরও অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন এনসিপির সদস্যসচিব আকরাম হোসাইন।

কারিনা কায়সারের মৃত্যু ঘিরে শোকের এই জমায়েতে পরিবার সদস্যদের বক্তব্য ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। জানাজার আগে কারিনার বাবা মুহাম্মদ কায়সার হামিদ কাঁপা কণ্ঠে বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তার মেয়ে এত মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে—এটা তার জন্য গর্বের বিষয়। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, কারিনা সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলত এবং সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তার মতে, কারিনা ছিল সাহসী ও প্রতিবাদী চরিত্রের এক তরুণী, যে সবসময় ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিত।

তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিনে হাজারো মানুষ ফোন করে সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন, অনেক শিক্ষার্থীও জানাজায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। যারা ভালোবেসেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, কারিনার জীবনে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে সবাই যেন তাকে ক্ষমা করে দেন।

কারিনার মা লোপা কায়সারের কণ্ঠ ছিল কান্নায় ভাঙা। তিনি বলেন, এই প্রজন্ম তাকে এখন চেনে “কারিনার আম্মু” নামে। তিনি বলেন, তার মেয়ে তাকে শূন্য করে দিয়ে গেছে, কিন্তু কারিনার হাসি, সাহস, সৃজনশীলতা ও প্রতিভা তাকে মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে। তার ভাষায়, কারিনার মতো মানুষ খুব কমই আসে, যে এতটা স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত ও সাহসী হতে পারে।

জানাজায় উপস্থিত রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারাও কারিনার জীবন ও ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অল্প বয়সে কারিনার মৃত্যুতে সবাই গভীরভাবে শোকাহত। তিনি বলেন, শহীদ মিনারে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ একত্রিত হয়েছে, কারণ তারা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চায়। তিনি আরও দাবি করেন, কারিনা অন্যায় ও গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুতে কেউ উল্লাস করলে সেটি নিন্দনীয় এবং ভবিষ্যতে এর জবাবদিহিতা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শহীদ মিনারের চারপাশে পুরো রাতজুড়ে ছিল ভিড় ও নীরবতা। অনেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, কেউবা দূর থেকে দাঁড়িয়ে নীরবে প্রার্থনা করেন। জানাজার পরও অনেকেই দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করেন, যেন বিদায়ের বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছিলেন না।

এই শোকাবহ বিদায় শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতির ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের আবেগ, আন্দোলন ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কারিনা কায়সারের নাম। শহীদ মিনারের সেই রাত তাই হয়ে উঠেছে এক অনিশ্চিত নীরবতার প্রতীক, যেখানে শোক আর শ্রদ্ধা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত