বিয়েতে নীরবতাই সম্মতি, আফগানে নতুন আইন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ১১ বার
বিয়েতে নীরবতাই সম্মতি, আফগানে নতুন আইন

প্রকাশ:  ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তানে নতুন পারিবারিক আইন কার্যকরের পর দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব এবং বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত নানা বিধান নিয়ে তৈরি এই নতুন আইনের কিছু ধারা মানবাধিকার ও নারী অধিকারের প্রশ্নে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিয়েতে ‘কুমারী মেয়ের’ নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করার বিধানটি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

তালেবান সরকারের প্রণীত এই নতুন পারিবারিক আইনকে বলা হচ্ছে একটি সমন্বিত পারিবারিক বিধিমালা, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া, অভিভাবকত্বের ক্ষমতা এবং পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আইনটির কিছু অংশ নারীর স্বাধীন সম্মতি ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আমু টিভি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুমোদনের পর এই ডিক্রি আফগান সরকারের গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে বিয়ে বাতিল এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন আইনের একটি আলোচিত ধারায় বলা হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো ‘কুমারী মেয়ের’ নীরবতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে একই বিধান অবিবাহিত পুরুষ বা বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এই পার্থক্যমূলক ব্যাখ্যা নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে। সমালোচকদের মতে, এটি নারীর স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে সীমিত করতে পারে এবং জোরপূর্বক বিয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আইনটিতে আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবারের বাবা ও দাদাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিয়ের জন্য সামাজিকভাবে উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন এবং ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত মোহরানার শর্ত পূরণ করতে হবে।

ডিক্রিতে “যৌবনে পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার” নামে একটি বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বলা হয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সম্পন্ন হওয়া বিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানের ইচ্ছার ভিত্তিতে বাতিল করা যেতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকবে।

আইন অনুযায়ী, যদি কোনো জীবনসঙ্গী অনুপযুক্ত বিবেচিত হয় অথবা মোহরানা অস্বাভাবিকভাবে বেশি বা ভারসাম্যহীন হয়, তবে সেই বিয়ে আইনগতভাবে বাতিলযোগ্য হতে পারে। পাশাপাশি বিচারকদের পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ব্যভিচার, ধর্মান্তর, স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং ‘জিহার’–সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারকরা বিচ্ছেদ, শাস্তি বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন।

আফগানিস্তানে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রবেশ বন্ধ এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান, ভ্রমণ ও জনসমাগমে অংশগ্রহণেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। নতুন পারিবারিক আইন সেই বিতর্ককে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই আইন নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সম্মতির মৌলিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করার বিধানটি জোরপূর্বক বিয়ের ঝুঁকি বাড়াবে বলে তাদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের অনুমোদন সংক্রান্ত বিধানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে তালেবান প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এই আইন ইসলামি শরিয়াহর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তৈরি এবং পারিবারিক কাঠামোকে সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তাদের দাবি, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলমান পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতা কমাতে এই বিধিমালা প্রয়োজন ছিল।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের একাংশ ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের এই নতুন আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্যকরভাবে নারী অধিকার ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের নতুন পারিবারিক আইন দেশটির সামাজিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত