প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলমান টেস্ট ম্যাচে চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ। একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের গতিপথ নিজেদের দিকে নিয়ে এসেছে স্বাগতিকরা। ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ছে পাকিস্তান, আর জয়ের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পাকিস্তান অধিনায়কের বিদায়। দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে দলকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন শান মাসুদ। কিন্তু ব্যক্তিগত ৭১ রানে এসে থেমে যায় তার প্রতিরোধ। তার আউটের মুহূর্তটি ম্যাচে নতুন মোড় তৈরি করে, কারণ এই উইকেটের পর পাকিস্তানের ইনিংসে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
ঘটনাটি ঘটে তাইজুল ইসলামের একটি নিয়ন্ত্রিত ডেলিভারিতে। বলটি ছিল ধীরগতির এবং ঘূর্ণনসহ, যা ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করে। শান মাসুদ ব্যাট সামনে এনে রক্ষণাত্মক খেলতে গেলে বল ব্যাটের প্রান্ত ছুঁয়ে চলে যায় ফিল্ডিংয়ে থাকা মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতে। আউট হওয়ার সময় তার ব্যক্তিগত রান ছিল ৭১, যা ম্যাচের আলোচনায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। একই সঙ্গে এক অদ্ভুত সমাপতন দেখা যায়, কারণ ক্যাচ নেওয়া ফিল্ডারের জার্সি নম্বরও ছিল ৭১।
এর আগে একই সেশনে পাকিস্তান শিবিরে প্রথম বড় ধাক্কা আসে বাবর আজমের বিদায়ে। শান মাসুদের সঙ্গে তার গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভেঙে দেয় তাইজুল ইসলাম। সেই মুহূর্তে পাকিস্তান কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল এবং বড় সংগ্রহের আশা করছিল। কিন্তু উইকেটের পেছনে অধিনায়ক লিটন দাসের দারুণ ক্যাচে ভেঙে যায় সেই পরিকল্পনা।
এরপর আরও চাপ বাড়ে পাকিস্তানের ওপর। সৌদ শাকিলও উইকেটে থিতু হতে পারেননি। নাহিদ রানার গতিময় এবং আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের সামনে তিনি বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। অফ স্টাম্পের বাইরে থাকা বল তাড়া করতে গিয়ে তিনি উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দেন। সেই ক্যাচটি আবারও নিশ্চিত করেন লিটন দাস, যিনি পুরো ম্যাচে কিপিংয়ে ছিলেন অত্যন্ত ধারাবাহিক।
এই ধারাবাহিক উইকেট পতনের ফলে পাকিস্তানের ইনিংস ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। একপাশে শান মাসুদ চেষ্টা করছিলেন ইনিংস ধরে রাখতে, অন্য পাশে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা। তার ব্যাটিংই তখন পাকিস্তান শিবিরের শেষ ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
মাঠের পরিস্থিতিও ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। সিলেটের উইকেটে বল নিচু হচ্ছিল, কখনও অতিরিক্ত টার্ন নিচ্ছিল আবার কখনও হঠাৎ বাউন্স করছিল। এমন অবস্থায় ব্যাটসম্যানদের জন্য দীর্ঘ সময় টিকে থাকা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের বোলাররা এই পরিস্থিতিকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
তাইজুল ইসলাম ছিলেন আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তার ধারাবাহিক লাইন ও লেংথ পাকিস্তান ব্যাটসম্যানদের বারবার সমস্যায় ফেলেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি সঠিক জায়গায় বল রেখে চাপ তৈরি করেছেন, যার ফলেই দ্রুত উইকেট এসেছে।
অন্যদিকে নাহিদ রানার গতি পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের স্বাভাবিক খেলায় বাধা সৃষ্টি করেছে। তার বলের গতি এবং বাউন্স ব্যাটসম্যানদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে ভুল শট খেলার দিকে। ফলে উইকেট পতনের ধারাবাহিকতা আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের ফিল্ডিংও এই দিনে ছিল প্রশংসনীয়। প্রতিটি ক্যাচ ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায় সব সুযোগই তারা কাজে লাগিয়েছে। বিশেষ করে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ধরে দলের বোলারদের আস্থা বাড়িয়েছেন।
শান মাসুদের বিদায়ের পর পাকিস্তানের ইনিংসে আর কোনো বড় প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। তার আউটের পর ব্যাটিং লাইনআপ দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। একসময় যে ইনিংস লড়াইয়ের মধ্যে ছিল, সেটি ধীরে ধীরে একতরফা অবস্থায় পরিণত হয়।
দর্শক গ্যালারিতে তখন উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সমর্থকরা বুঝতে শুরু করেন যে ম্যাচটি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বোলারদের ধারাবাহিক আক্রমণ এবং ফিল্ডারদের সক্রিয়তা ম্যাচের পুরো চিত্র বদলে দিয়েছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই সেশনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল ম্যাচ নির্ধারণী। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট তুলে নেওয়া এবং চাপ ধরে রাখার সক্ষমতা দলকে বড় সুবিধা এনে দিয়েছে। বিশেষ করে বাবর আজম এবং শান মাসুদের উইকেট পতন ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।
এখন পরিস্থিতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যেখানে বাংলাদেশ জয় থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তবে ক্রিকেটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়, তাই শেষ সেশনে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক ও পরিকল্পিত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিনের এই সেশনটি বাংলাদেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিন। যদি এই ধারাবাহিকতা তারা ধরে রাখতে পারে, তবে একটি স্মরণীয় জয় তাদের অপেক্ষায় রয়েছে।