চীন–রাশিয়া ঘনিষ্ঠতার নেপথ্য কারণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
চীন রাশিয়া সম্পর্ক বিশ্লেষণ

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি তাদের কৌশলগত সহযোগিতাও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

সম্প্রতি বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় দুই নেতাকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন, দীর্ঘায়ু এবং মানুষের সম্ভাব্য আয়ু বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ওই কথোপকথন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দুই নেতার সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল।

দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে চীন হয়ে উঠেছে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।

অন্যদিকে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত জোট বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্কের ভিত্তি মূলত তিনটি স্তরে গড়ে উঠেছে—শক্তির ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং পশ্চিমা প্রভাব মোকাবিলা।

রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস, চীনের শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ নিশ্চিত করছে। একইভাবে চীনের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ভোক্তা বাজার রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।

তবে এই সম্পর্ককে শুধুই অর্থনৈতিক সহযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি একটি ধীর কিন্তু সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ, যেখানে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে একটি বিকল্প শক্তি কেন্দ্র গড়ে উঠছে।

সম্প্রতি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকাশ্য বক্তব্য ও সাক্ষাতে একে অপরকে “ঘনিষ্ঠ বন্ধু” এবং “কৌশলগত অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এই দুই নেতা একে অপরের প্রতি ব্যক্তিগত আস্থাকেও রাজনৈতিক সমীকরণের অংশে পরিণত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের সম্পর্কের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি অভিন্ন অনাস্থা এবং নিজস্ব প্রভাববলয় বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। এই অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই দেশকে ক্রমেই কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার কারণে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরও কৌশলগত রূপ নিচ্ছে। সামরিক সহযোগিতা, যৌথ মহড়া এবং প্রযুক্তি বিনিময় এই সম্পর্ককে আরও গভীর করছে।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এই সম্পর্ক পুরোপুরি নিঃশর্ত নয়। দুই দেশের মধ্যেই রয়েছে স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্য। চীন অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হলেও রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সামরিক সক্ষমতা ও জ্বালানি সম্পদ। ফলে সম্পর্কটি এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দুই নেতার উপস্থিতি এবং তাদের অনানুষ্ঠানিক কথোপকথন বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘায়ু ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে তাদের মন্তব্যকে অনেকে প্রতীকী হিসেবে দেখছেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকার ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব আলাপচারিতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের বাস্তব কৌশলগত পদক্ষেপ। বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামরিক ভারসাম্যে এই জোট ধীরে ধীরে নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

এদিকে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়াও এই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতাকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক শীতল প্রতিযোগিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে চীন ও রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা কেবল দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনশীল রূপের প্রতিচ্ছবি। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতি, যুদ্ধ-শান্তি পরিস্থিতি এবং শক্তির ভারসাম্যের ওপর।

বিশ্ব রাজনীতির এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট—চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন আর কেবল কূটনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত জোট, যা আগামী দশকগুলোতে বিশ্বব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত