প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলাতঙ্ক এখনো একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে রয়ে গেছে। কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগে আক্রান্ত হলে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় নিশ্চিত বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য তথ্য অনুযায়ী, দেশে আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি, বরং অবহেলা ও সচেতনতার অভাবে এখনো প্রাণহানি ঘটছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। একবার মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়িয়ে গেলে রোগটি দ্রুত মারাত্মক রূপ নেয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
দেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের তুলনায় সচেতনতা ও টিকাদান কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় মৃত্যুহার কিছুটা কমেছে। তবে এখনো প্রতিবছর অনেক মানুষ জলাতঙ্কে প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা নিতে দেরি করা, ক্ষত পরিষ্কার না করা এবং টিকা গ্রহণে অনীহা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন প্রধানত কুকুর ও বিড়াল থেকেই সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। শহর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় পোষা প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কামড় নয়, অনেক সময় আঁচড় বা ক্ষতস্থানে লালা লাগলেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, জলাতঙ্কের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর শরীরে জ্বর, দুর্বলতা, মাথাব্যথা এবং কামড়ের স্থানে ব্যথা বা ঝিনঝিন অনুভূতি দেখা দিতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে স্নায়বিক জটিলতা দেখা দেয়, যেমন অস্বাভাবিক আচরণ, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, ভয় এবং হ্যালুসিনেশন।
বিশেষ করে পানি দেখলে ভয় লাগা, অতিরিক্ত লালা পড়া এবং আক্রমণাত্মক আচরণ রোগটির অন্যতম পরিচিত লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে বাতাসের ভয়, খিঁচুনি এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব লক্ষণ শুরু হলে রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করতে হবে। দেরি করা বা অবহেলা করা জীবনহানির কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে পোষা প্রাণীকে নিয়মিত টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিশুদের বিশেষভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা অপরিচিত প্রাণীর কাছে না যায় বা উসকানি না দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, যার বড় অংশই এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে ঘটে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহপালিত কুকুরই সংক্রমণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত। উন্নত দেশগুলোতে কঠোর প্রাণী নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত টিকাদানের কারণে এই রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে, তবে এখনো ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার অভাব, চিকিৎসা সেবা পাওয়ার দেরি এবং টিকার প্রাপ্যতা নিয়ে জটিলতা সমস্যা তৈরি করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন, যা আর কার্যকর হয় না।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, যারা প্রাণীর সংস্পর্শে বেশি থাকেন, যেমন পশুচিকিৎসক বা প্রাণী উদ্ধারকর্মী, তাদের জন্য আগাম প্রতিরোধমূলক টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জলাতঙ্ক নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রাণী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসকদের ভাষায়, জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ যেখানে প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে চিকিৎসা কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়। তাই সন্দেহজনক কামড় বা আঁচড়কে কখনোই অবহেলা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া জলাতঙ্ক নির্মূল সম্ভব নয়। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই পারে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করতে।