প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় আবারও ভয়াবহ গণ-অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওইও অঙ্গরাজ্যের একাধিক স্কুলে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৩৯ জন শিক্ষার্থী ও সাতজন শিক্ষককে অপহরণ করেছে বন্দুকধারীরা। স্থানীয় প্রশাসন ও একটি খ্রিস্টান সংগঠনের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে গত ১৫ মে, তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ১৮ মে। ওইও অঙ্গরাজ্যের আহোরো এসিনেলে এলাকায় একই সময়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে সমন্বিতভাবে এই হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন অব ওইও অঙ্গরাজ্যের চেয়ারম্যান এলিশা ওলুকায়োদে ওগুনদিয়া জানান, হামলার পর মোট ৪৬ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। অপহৃতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু, যাদের বয়স দুই থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। এই ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পরিকল্পিত ও সমন্বিত একটি হামলা। একাধিক সশস্ত্র দল একই সময়ে বিভিন্ন স্কুলে প্রবেশ করে দ্রুতগতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জিম্মি করে নিয়ে যায়। ইয়াওটা এলাকার ব্যাপটিস্ট নার্সারি ও প্রাইমারি স্কুলসহ আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই হামলার শিকার হয়।
ঘটনার পর নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু কঠোর ভাষায় এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি একে ‘বর্বরোচিত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ফেডারেল সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছে এবং দ্রুত সব অপহৃতকে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ওইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ওলুসেই আবিওদুন মাকিন্ডে জানিয়েছেন, অপহৃতদের মধ্যে থাকা এক শিক্ষককে পরে হত্যা করা হয়েছে। একটি ভিডিও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এই খবর প্রকাশের পর স্থানীয় এলাকায় শোক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে অপহরণকারীদের সহযোগী ও তথ্যদাতাও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
অন্যদিকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, অভিযান চলাকালে তারা হামলাকারীদের পুঁতে রাখা বিস্ফোরকের মুখোমুখি হন। এতে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী আহত হন এবং বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় জনগণ বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর নিরাপদ নয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
নাইজেরিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অপহরণ একটি বড় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্বল নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় স্কুল, যাত্রীবাহী যানবাহন এবং সাধারণ জনগণ প্রায়ই এই ধরনের হামলার শিকার হচ্ছে। অপহরণকারীরা সাধারণত মুক্তিপণের জন্য এসব মানুষকে জিম্মি করে রাখে।
যদিও নাইজেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়, তবুও সাম্প্রতিক এই হামলা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন দেশের নতুন নতুন অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার স্কুলে হামলার ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ায় স্কুলে উপস্থিতি কমে যাচ্ছে, যা শিক্ষার মান ও ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত ও কার্যকর উদ্ধার অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, শিশু ও শিক্ষকদের লক্ষ্য করে এমন হামলা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।
এদিকে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, তারা অপহৃতদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত অপহৃতদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে নাইজেরিয়ার এই সাম্প্রতিক স্কুল অপহরণ দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এটি পুরো অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় জনগণ এখন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে অপহৃতদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।