পদোন্নতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বরখাস্ত মিজান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ২১ বার
পদোন্নতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বরখাস্ত মিজান

প্রকাশ: ২০ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স–এ এক দিনের ব্যবধানে ঘটে গেল চাঞ্চল্যকর এক প্রশাসনিক নাটক। সকালে মহাব্যবস্থাপক, দুপুরে পরিচালক পদে পদোন্নতি, বিকেলে সেই আদেশ বাতিল এবং পরদিন চাকরি থেকেই সাময়িক বরখাস্ত—মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মোহাম্মদ মিজানুর রশীদকে ঘিরে এমন ঘটনাপ্রবাহে তোলপাড় চলছে বিমানের অভ্যন্তরে।

বিমান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তবুও প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক শাখায় প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি। তার পদোন্নতি এবং পরদিনই বরখাস্ত হওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, সোমবার সকালে বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মিজানুর রশীদকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়ার ঘোষণা আসে। আদেশটিতে সই করেন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) খন্দকার বাকী উদ্দিন আহম্মদ। ওই আদেশ প্রকাশের পরপরই বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকায় শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

বিমানের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংস্থাটির ভেতরে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি অংশ মিজানুর রশীদের পদোন্নতিকে স্বাগত জানিয়ে তার কক্ষে অভিনন্দন জানাতে ছুটে যান। তবে সংস্থার অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বিষয়টিকে বিস্ময় এবং ক্ষোভের চোখে দেখেন। তাদের ভাষ্য, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন, তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করলে একই দিন বিকেলে পদোন্নতির সেই আদেশ বাতিল করা হয়। তবে সেখানেই শেষ হয়নি নাটকীয়তা। পরদিন মঙ্গলবার বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমদ–এর সই করা এক আদেশে মিজানুর রশীদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বরখাস্তের আদেশে বলা হয়, “বাংলাদেশ বিমান করপোরেশন এমপ্লয়িজ (সার্ভিস) রেগুলেশন্স, ১৯৭৯”–এর অনুচ্ছেদ ৫৮ অনুযায়ী আগামী ২০ মে ২০২৬ থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। একই সঙ্গে আদেশে উল্লেখ করা হয়, বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন এবং নির্ধারিত ঠিকানায় অবস্থান করবেন।

বিমান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মিজানুর রশীদের উত্থান ছিল অনেকটাই অস্বাভাবিক। তিনি মূলত মহাব্যবস্থাপক পদে থাকলেও ধীরে ধীরে সংস্থার অর্থ বিভাগ, প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। অনেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদার বাইরে গিয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।

বিশেষ করে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পাশাপাশি অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্বও তার হাতে থাকা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে প্রশ্ন ছিল। কারণ এই দুটি বিভাগই বিমানের আর্থিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, বদলি এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে একই ব্যক্তির হাতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকাকে অনেকে অস্বাভাবিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছিলেন।

মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সফটওয়্যার কেনাকাটায় অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কেনার নামে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হলেও পরে তিনি অব্যাহতি পান। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

বিমান সূত্রের দাবি, চলমান অনুসন্ধানের মধ্যেই গত ৪ মার্চ তাকে মহাব্যবস্থাপক (যানবাহন) পদ থেকে সরিয়ে অর্থ ও হিসাব বিভাগে নেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র একদিন পরই আবার তাকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে তাকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত করা হয়।

এই দ্রুত বদলি ও পুনর্বহালকে ঘিরেও তখন সংস্থার অভ্যন্তরে নানা আলোচনা ছিল। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, বিমানের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় কাজ করছে, যার কারণে বিতর্কিত কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বিমানের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাতিল হয়ে যায়, তবে তা প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে এটি প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে চাপ, লবিং এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমানের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সংস্থাটি নানা বিতর্ক, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ব্যবস্থাপনা সংকটে বারবার আলোচনায় এসেছে। কখনো উড়োজাহাজ কেনা, কখনো নিয়োগ-বাণিজ্য, আবার কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে মিজানুর রশীদকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই ঘটনাও বৃহত্তর সংকটেরই একটি প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন অনেকে।

বিমানের অভ্যন্তরে এখন আলোচনার বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—কী কারণে এত দ্রুত পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং কী ধরনের পরিস্থিতিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, যদি তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই গুরুতর অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তাকে এতদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়েছিল কেন।

এদিকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ বলছেন, এটি অনেক দেরিতে হলেও একটি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে এই ঘটনা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিজানুর রশীদকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত