প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত মহান নবী হজরত ইউনুস (আ.)-এর জীবনঘনিষ্ঠ একটি অলৌকিক ঘটনা মানব ইতিহাসে ধৈর্য, অনুশোচনা ও আল্লাহর রহমতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে মাছের পেটে তার অবস্থান এবং সেখান থেকে মুক্তির ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে গভীর শিক্ষা ও তাৎপর্য বহন করে। এই ঘটনাটি বিভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সুরা আম্বিয়া, সুরা সাফফাত, সুরা ইউনুস এবং সুরা আল-কালাম।
মহান আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন—
“وَ ذَاالنُّوۡنِ اِذۡ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ اَنۡ لَّنۡ نَّقۡدِرَ عَلَیۡهِ فَنَادٰی فِی الظُّلُمٰتِ اَنۡ لَّاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنۡتَ سُبۡحٰنَكَ ٭ۖ اِنِّیۡ كُنۡتُ مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ”
অর্থ: ‘আর স্মরণ কর জুন-নুনের কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকারে ডেকে বলেছিল, আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৭)
ইসলামী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইউনুস (আ.)-কে আল্লাহ তাআলা ইরাকের নিনেভা বা নিনওয়া অঞ্চলের এক জাতির প্রতি নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে তাদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানান। কিন্তু সেই জাতি তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে অবাধ্যতা ও কুফরিতে লিপ্ত থাকে।
দীর্ঘদিনের দাওয়াতের পর ইউনুস (আ.) ব্যথিত ও হতাশ হয়ে ধারণা করেন যে তার জাতির ওপর শিগগিরই আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে। কিছু বর্ণনায় এসেছে, সেই সময় শাস্তির কিছু লক্ষণও দেখা দিতে শুরু করেছিল। তিনি তখন তাদের ছেড়ে চলে যান, আল্লাহর ফয়সালার প্রতীক্ষা না করেই।
অন্যদিকে, তার চলে যাওয়ার পর তার জাতি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা অনুভব করে। তখন তারা আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই একত্র হয়ে কান্নাকাটি ও প্রার্থনায় লিপ্ত হয়। এমনকি তারা সন্তানদের মায়েদের থেকে আলাদা করে দিয়ে এক অনন্য অনুশোচনার পরিবেশ তৈরি করে। তাদের এই আন্তরিক তওবা আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং নির্ধারিত আজাব উঠিয়ে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর ইউনুস (আ.) যখন জানতে পারেন যে তার জাতি ধ্বংস হয়নি, বরং তারা ক্ষমা পেয়ে গেছে, তখন তিনি গভীর মানসিক উদ্বেগে পড়েন। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তিনি আশঙ্কা করেন যে তার সম্প্রদায় তাকে মিথ্যাবাদী মনে করতে পারে। এই ভয়ে তিনি পুনরায় তাদের কাছে না গিয়ে অন্যদিকে সফর শুরু করেন।
সফরের এক পর্যায়ে তিনি একটি নৌকায় ওঠেন। কিন্তু সমুদ্রের মাঝখানে গিয়ে নৌকাটি প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে এবং ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন নাবিকরা সিদ্ধান্ত নেন, নৌকার ভার কমাতে একজন যাত্রীকে পানিতে ফেলতে হবে। কার নাম বেছে নেওয়া হবে তা নির্ধারণের জন্য লটারির ব্যবস্থা করা হয়।
আল-কোরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “অতঃপর লটারী করা হলে তিনি পরাজিতদের অন্তর্ভুক্ত হলেন।” (সুরা সাফফাত, আয়াত ১৪১)
লটারিতে বারবার ইউনুস (আ.)-এর নাম উঠতে থাকায় তিনি বুঝতে পারেন যে এটি আল্লাহর ইচ্ছা। তখন তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে নিজেই পানিতে ঝাঁপ দেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা এক বিশাল মাছকে নির্দেশ দেন। মাছটি তাকে গিলে ফেলে, তবে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার কোনো ক্ষতি করা হয়নি। তাকে রাখা হয় গভীর সমুদ্র, মাছের পেট এবং রাতের অন্ধকার—এই তিন অন্ধকারের মধ্যে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ইউনুস (আ.) সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। তিনি বলেন, “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন”—অর্থাৎ, “আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র-মহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”
এই দোয়া ইসলামী ইতিহাসে ‘দোয়া ইউনুস’ নামে পরিচিত, যা বিপদ, দুঃখ ও সংকট থেকে মুক্তির অন্যতম শক্তিশালী দোয়া হিসেবে মুসলিম সমাজে প্রচলিত।
আল্লাহ তাআলা তার আন্তরিক অনুশোচনা ও তওবা কবুল করেন এবং তাকে মাছের পেট থেকে মুক্তি দেন। এরপর তিনি পুনরায় সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরে আসেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
তাফসিরবিদদের মতে, এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো—মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু আন্তরিক অনুশোচনা ও আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে ক্ষমা লাভ সম্ভব। একই সঙ্গে এটি ধৈর্য, বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ইবনে কাসির, তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনসহ বিভিন্ন প্রামাণ্য তাফসির গ্রন্থে এই ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সব ব্যাখ্যায় একই মূল বার্তা উঠে এসেছে—আল্লাহর রহমত অসীম, এবং আন্তরিক তওবার দরজা সবসময় খোলা।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, ইউনুস (আ.)-এর ঘটনা মানবজীবনে হতাশা, রাগ বা তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। পাশাপাশি এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সংকট যত গভীরই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখলে মুক্তি অবশ্যই আসে।
সব মিলিয়ে, মাছের পেটে ইউনুস (আ.)-এর এই অলৌকিক ঘটনা শুধু একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা বিশ্বাস, ধৈর্য ও অনুশোচনার শক্তিকে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।