হাসপাতালে খাবার দেখে অসন্তুষ্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ১৩ বার
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনা শহরের সরকারি সদর হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে হাসপাতালের রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার সকালে এই পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের রান্নাঘর ও খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা ঘুরে দেখেন তিনি। পরে রোগীদের জন্য রান্না করা সবজি সরাসরি পরীক্ষা করে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্টদের তীব্রভাবে সতর্ক করেন।

পরিদর্শনকালে মন্ত্রী হাসপাতালের খাবার বিতরণ ব্যবস্থার নানা অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেন বলে জানা গেছে। রান্নাঘরে প্রস্তুত খাবারের মান যাচাই করতে গিয়ে তিনি কিছু সবজি মুখে নিয়ে স্বাদ পরীক্ষা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা ফেলে দেন। উপস্থিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, এই ধরনের খাবার নিজেদের পরিবারের জন্য হলে কেউ কি তা গ্রহণ করতেন। তাঁর এই মন্তব্যের পর উপস্থিত অনেকেই নীরব হয়ে যান।

মন্ত্রী এরপর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোগীদের খাবারের মান উন্নয়নে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। খাবারের মান নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি কঠোর অবস্থান জানান।

পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে মন্ত্রী রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। সেখানে রোগীরা চিকিৎসা সেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং বিশেষ করে নির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক টিকা সংক্রান্ত নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় টিকা পেতে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে টাকা দিয়ে টিকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এমন অভিযোগ শোনার পর মন্ত্রী বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গাজী রফিকুল ইসলাম তখন জানান, সরবরাহে কিছু জটিলতার কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে মন্ত্রী এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিষয়টির আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করেন।

পরবর্তীতে মন্ত্রী ঢাকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়। যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। এই তথ্য পাওয়ার পর তিনি আরও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার নির্দেশ দেন।

মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়। যারা দায়িত্বে থেকে অবহেলা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর এই মন্তব্যের পর হাসপাতাল এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিদর্শনের সময় মন্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতও ছিলেন। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রোগীসেবার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রীর আকস্মিক এই পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। আগেভাগে কোনো ঘোষণা না থাকায় অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী হঠাৎ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বিশেষ করে খাবার সরবরাহ ও টিকা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে দ্রুত নথিপত্র ও তথ্য উপস্থাপন করতে দেখা যায় সংশ্লিষ্টদের।

পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। রোগীরা এখানে আসে আশ্রয় ও নির্ভরতার আশায়, তাই তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের অবহেলা করা হলে তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।

এদিকে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা রয়েছে। বাজেট, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে মাঝে মাঝে খাবার ও ওষুধ সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়। তবে এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে তারা মনে করেন।

রোগীদের পক্ষ থেকেও মন্ত্রীর এই পরিদর্শনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। অনেক রোগী জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও এমন উচ্চপর্যায়ের নজরদারি খুব কমই দেখা যায়। ফলে এই ধরনের পরিদর্শন ভবিষ্যতে হাসপাতাল ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান উন্নয়নে নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। শুধু পরিদর্শন নয়, বরং ধারাবাহিক সংস্কার, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। নইলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।

সব মিলিয়ে খুলনা সদর হাসপাতালের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। রোগীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং মন্ত্রীর কঠোর অবস্থান মিলিয়ে বিষয়টি এখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঘটনার পর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় নতুন করে নজরদারি বাড়ানো হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত