প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আবারও মূল্য সমন্বয় নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবকে ঘিরে ব্যবসায়ী, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, যার ফলে বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ মূল্য কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বুধবার সকালে রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এই প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ সামাল দিতে না পারলে পুরো খাত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম শুনানিতে বলেন, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি এবং আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তার মতে, এই আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই।
প্রস্তাব অনুযায়ী ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম দেড় টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা মোটামুটি ২১ শতাংশ বৃদ্ধির সমান। পিডিবির যুক্তি অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজন। গণশুনানিতে উপস্থিত রাজনৈতিক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, খাতে যেসব অনিয়ম ও অপচয় রয়েছে, তার বোঝা সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অনেক অংশীজন অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো ঠিক নয়। বরং খাতের ভেতরের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করাই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা শুনানিতে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শুধু গৃহস্থালি খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উৎপাদন খাত ও শিল্পেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পখাত এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া একাধিক বক্তা বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, খাতে যেকোনো ধরনের আর্থিক ঘাটতির কারণ বিশ্লেষণ করে প্রথমে অপচয় ও অনিয়ম কমানো উচিত, তারপর মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দাম এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপ সামাল দিতে না পারলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
তারা আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ, যেখানে আর্থিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অংশীজনদের মতে, মূল্য বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করা উচিত। তারা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেন।
গণশুনানিতে উপস্থিত বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি সরাসরি জনগণের জীবনযাত্রা ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বৃহস্পতিবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আরেকটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হতে পারে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন নজর থাকবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।