প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন নেইমার। দীর্ঘ সময় ধরে ইনজুরি, ফর্ম ও দলে তার ভূমিকা নিয়ে চলা নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি জায়গা পেয়েছেন ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে। তবে এবার তার ভূমিকা আগের মতো এককেন্দ্রিক বা নেতৃত্বভিত্তিক থাকছে না বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, দল ঘোষণার আগেই ভিডিও কলে নেইমারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন আনচেলত্তি। সেখানে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন, দলের পরিকল্পনায় নেইমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এবার তার ভূমিকা সীমিত ও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ, তাকে কেন্দ্র করে পুরো আক্রমণভাগ সাজানোর আগের কৌশল আর অনুসরণ করা হচ্ছে না।
ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টরও ওই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে নেইমারকে জানানো হয়, তিনি আর দলের অধিনায়ক থাকছেন না। একই সঙ্গে শুরুর একাদশে তার জায়গাও নিশ্চিত নয়। বিষয়টি ব্রাজিল ফুটবলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে নেইমারকে কেন্দ্র করেই আক্রমণাত্মক কৌশল সাজিয়ে এসেছে। তবে আনচেলত্তির নতুন পরিকল্পনায় সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোচ ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রথম একাদশ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন, যেখানে তরুণ খেলোয়াড়দের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে নেইমারের অবস্থান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু মাঠের কৌশল নয়, খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা ও মনোযোগ নিয়েও নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন আনচেলত্তি। এর মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সক্রিয়তা কমানো। খেলোয়াড়দের পুরো মনোযোগ যেন অনুশীলন ও ম্যাচ প্রস্তুতিতে থাকে, সেটিই এই নির্দেশনার মূল লক্ষ্য।
তবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি নেইমারের প্রতি আস্থা ও সম্মানও প্রকাশ করেছেন কোচ। তার মতে, নেইমার এখনও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে তার অভিজ্ঞতা, খেলায় সৃজনশীলতা এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।
আনচেলত্তি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নেইমারকে শুধু বিকল্প বা সীমিত খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে তাকে নির্ভর করে পুরো কৌশল সাজানো হবে না, বরং দলের ভারসাম্য বজায় রেখে ব্যবহার করা হবে।
দলের ভেতরের সূত্র বলছে, পুরো বিষয়টি নেইমার ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। কোচিং স্টাফের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন, দলের প্রয়োজনে যেকোনো ভূমিকায় খেলতে তিনি প্রস্তুত। স্কোয়াড ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দলের প্রতি শুভেচ্ছাও জানান, যা তার পেশাদার মনোভাবেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্রাজিল দলের জন্য একটি কৌশলগত রূপান্তরের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে দলটি নেইমার-কেন্দ্রিক আক্রমণাত্মক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করলেও এখন ধীরে ধীরে সেটি দলভিত্তিক ও সমন্বিত কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। এতে করে একক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে এবং দলীয় ভারসাম্য বাড়বে।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে একটি দলের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে কৌশলগত নমনীয়তার ওপর। আনচেলত্তি সম্ভবত সেই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। তরুণ খেলোয়াড়দের সঙ্গে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয় করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়াই এখন তার মূল লক্ষ্য।
নেইমারের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনকে অনেকেই নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলের প্রধান মুখ হিসেবে খেলেছেন এবং আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। এখন সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে নতুন ভূমিকা গ্রহণ করা তার জন্য মানসিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই পরীক্ষা হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা এখনও ব্রাজিলের জন্য বড় সম্পদ। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তন করার ক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে, যা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্রাজিল দলে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আনচেলত্তির নেতৃত্বে দলটি ধীরে ধীরে নতুন কৌশল ও নতুন কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নেইমার থাকলেও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আর আগের মতো একক আধিপত্য থাকবে না।
আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এই পরিবর্তন কতটা কার্যকর হয়, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত ব্রাজিল ফুটবলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে নেইমারের নতুন ভূমিকা এবং আনচেলত্তির কৌশলগত পুনর্গঠন।