ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চাপে ফেলল মার্কিন সিনেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে চাপে ফেলল মার্কিন সিনেট

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত ক্ষমতা সীমিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে অগ্রগতি পাওয়ার পর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট শুধু একটি আইনি বা সাংবিধানিক প্রশ্ন নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, মধ্যপ্রাচ্য কৌশল এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সূচনা করেছে।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সিনেট ভোটে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট পড়ে ৫০টি এবং বিপক্ষে ৪৭টি। এতে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির চারজন সিনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একমত হন। যদিও প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্তভাবে পাস হয়নি, তবুও এটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

প্রস্তাবটির মূল বিষয় হলো, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীনভাবে থাকা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা এবং বড় সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকা উচিত বলেই মত দিয়েছেন প্রস্তাবটির সমর্থকরা।

এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন। তিনি বলেন, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই কংগ্রেসের উচিত নিজেদের সাংবিধানিক ভূমিকা আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা। তার অভিযোগ, তেহরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সমাধানের যে ইঙ্গিত এসেছে, তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

মার্কিন রাজনীতিতে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান উত্তেজনার পর বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। অনেক আইনপ্রণেতা মনে করেন, একক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

১৯৭৩ সালের যুদ্ধক্ষমতা আইন অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ষাট দিন সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। এরপর অভিযান চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয় অথবা সেনা প্রত্যাহারের জন্য অতিরিক্ত সময় চাইতে হয়। তবে বাস্তবে বিভিন্ন সময় প্রেসিডেন্টরা এই ক্ষমতার বিস্তৃত ব্যাখ্যা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক ভোটে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সিনেটরের অবস্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। র্যান্ড পল, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকোসি এবং বিল ক্যাসিডি প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরেও ভিন্নমত রয়েছে।

অন্যদিকে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান একমাত্র ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের হাতে কিছু জরুরি সামরিক ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা সংকট, জাহাজে হামলার অভিযোগ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং মিত্র দেশগুলোর স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সীমিত সামরিক অভিযান চালানো প্রয়োজন হতে পারে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান সেনাপতি হিসেবে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

তবে সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের মতো বড় সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে নেওয়া হলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাদের মতে, জনগণের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছাড়া যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী।

এর আগে চলতি বছরে একই ধরনের কয়েকটি প্রস্তাব রিপাবলিকানদের বিরোধিতায় আটকে যায়। প্রতিনিধি পরিষদেও অনুরূপ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু এবার সিনেটে প্রস্তাবটির অগ্রগতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক মতবিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে।

সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এবং যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিনেটের এই ভোট দেখিয়ে দিয়েছে, প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা নিয়ে কংগ্রেস এখন আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে। আগামী দিনে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত