প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন কঠোর শর্ত আরোপ করেছে ইরান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী জাহাজকে এখন থেকে ইরানের নবগঠিত নৌ-কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
বুধবার (২০ মে) তেহরান থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, হরমুজ প্রণালির নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ব্যবহার করতে হলে বিশেষ লাইসেন্স বা পারমিট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এই নিয়ন্ত্রিত নৌ-অঞ্চলের বিস্তারিত মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জাহাজ চলাচলের সীমা ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঘোষণায় বলা হয়, ইরানের কেশম দ্বীপ থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল-কুয়াইন পর্যন্ত এবং জাবাল মুবারক থেকে ফুজাইরাহর দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র এলাকা এই নতুন নিয়ন্ত্রণ জোনের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই এলাকায় প্রবেশ ও পারাপারের ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে ইরানি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করতে হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নৌ-চলাচলের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান নৌযান চলাচল ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই নতুন সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনারও একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে নতুন শর্ত আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের পদক্ষেপ কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের একতরফা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে নৌ-চলাচলে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেলবাহী ট্যাংকার এই পথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা বা বিধিনিষেধ সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে ইরানের নতুন এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এখন নজর থাকবে অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর।