প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মোট ২৫ কোটি টাকা ‘নিয়ে যাওয়ার’ এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া। প্রশাসকের এমন বক্তব্য গণমাধ্যমে আসার পর তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। এই গুরুতর ও সংবেদনশীল অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতে এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় নিজের অবস্থান এবং সরকারি বরাদ্দের আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট করেছেন ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘হাস্যকর, বানোয়াট ও মানহানিকর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ভিডিও বার্তার শুরুতেই আসিফ মাহমুদ গণমাধ্যমের চটকদার শিরোনামের সমালোচনা করে একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় শিরোনাম দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারেন, যা দেখতে অনেকটা এমন শোনায় যে—আগামী দিনের প্রস্তাবিত বা উদীয়মান বাজেট যদি ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হয়, আর কেউ যদি বলে এই টাকা তারেক রহমান পকেটে করে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকার যখন নির্দিষ্ট কিছু খাতে খরচের জন্য এক বছরের একটি বাজেট নির্ধারণ করে, তা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পকেটে যায় না। ঠিক তেমনিভাবে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসকের পক্ষ থেকে আসা বিবৃতিটি অত্যন্ত অবাস্তব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দকে ব্যক্তিগতভাবে ‘টাকা নিয়ে যাওয়া’ হিসেবে উপস্থাপন করা চরম অজ্ঞতা ও মানহানির শামিল।
সরকারি বাজেট ও স্থানীয় সরকার বিভাগের বরাদ্দ প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, বিগত অর্থবছরগুলোতে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সমবায় মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ছিল ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এই বিশাল তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ থাকে ‘বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে, যা যেকোনো মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা সচিবের এখতিয়ারে থাকে। দেশের যেকোনো প্রান্তের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনা করে এই বিশেষ তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। এর বাইরে যে সাধারণ বরাদ্দ থাকে, তা সাধারণত জনসংখ্যার অনুপাত, উপজেলার সংখ্যা এবং ভোটারের হারের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট রেশিও বা অনুপাত অনুযায়ী বন্টন করা হয়। যেমন ফেনী জেলার চেয়ে কুমিল্লা জেলায় উপজেলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কুমিল্লার জন্য বরাদ্দ বেশি বরাদ্দ আসে।
আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট করে জানান যে, এই বরাদ্দ মূলত পাঁচটি খাতে বিভক্ত হয়—জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন। প্রতি বছর এই টাকা চার কিস্তিতে অবমুক্ত করা হয়। জেলা পরিষদের বন্টন প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় যে কোন খাতে কত টাকা খরচ হবে।
কমিটি বসে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পুনরায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ফলে কোনো একজন ব্যক্তি চাইলেই একক সিদ্ধান্তে এই টাকা নিজের মতো করে ব্যবহার বা পকেটে পুরতে পারেন না। এর পেছনে একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া জড়িত থাকে।
কুমিল্লার বর্তমান প্রশাসকের আইনি অজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, প্রশাসক মোস্তাক মিয়া প্রথমত একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাঁচা মিথ্যা কথা বলেছেন যে এই টাকা রাজস্ব খাতের। রাজস্ব খাতের বাজেট বছরের শুরুতেই জেলা পরিষদ নিজস্ব খরচের জন্য সুনির্দিষ্ট করে রাখে এবং সেখান থেকে কারও এলাকায় আলাদা করে বরাদ্দ নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
মূলত এই টাকাটি ছিল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘বিশেষ বরাদ্দ’, যা তিনি অজ্ঞতাবশত রাজস্ব খাতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। এই বিশেষ বরাদ্দটি সাধারণত ১০০ থেকে ১২৫ কোটি টাকার মতো হয়ে থাকে এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে আবেদনের ভিত্তিতে এই বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের বিভিন্ন রাস্তাঘাট বা জনকল্যাণমূলক কাজের আবেদনের ওপর ভিত্তি করেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং বরাদ্দ দেওয়ার পরও স্থানীয় কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া তা ব্যয় করা যায় না।
বিষয়টির শতভাগ স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে আসিফ মাহমুদ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসের কুমিল্লা জেলা পরিষদের মাসিক সভার অফিশিয়াল কার্যবিবরণীর বিবরণ তুলে ধরেন। সেখানে দেখা যায়, বিশেষ বরাদ্দের টাকা সোলার লাইট স্থাপন, কর্মহীন অসহায় মানুষের কর্মসংস্থান, বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের আসবাবপত্র তৈরি এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মসজিদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সব টাকাই সরকারি ক্রয় নীতিমালা বা পিপিআর অনুযায়ী সম্পূর্ণ ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তিকে ক্যাশ বা নগদে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ভিডিও বার্তার শেষ দিকে আসিফ মাহমুদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা তাদের মনোনীত এই প্রশাসকদের ন্যূনতম প্রশাসনিক শিক্ষা-দীক্ষা দেন। তিনি বলেন, এসএসসি পাস কোনো ব্যক্তিও রাজস্ব খাত আর বিশেষ বরাদ্দের মধ্যে পার্থক্য বোঝেন। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য এক ধরনের হ্যারাসমেন্ট বা হয়রানি।
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক যদি অনতিবিলম্বে তার এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পরিষ্কার না করেন, তবে তিনি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবেন। দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রতি যেকোনো খবর বিশ্বাস করার আগে তা ক্রস চেক বা যাচাই করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের প্রশাসন সব সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো বিভ্রান্তি এড়াতে মার্কিন প্রশাসনের মতো আগের প্রশাসনের সাথে বসে আলোচনা করাই ছিল পরিপক্ক রাজনীতির লক্ষণ।