ইসলামের দৃষ্টিতে জাহান্নামিদের প্রধান তিনটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ৭২ বার
ইসলামের দৃষ্টিতে জাহান্নামিদের প্রধান তিনটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

প্রকাশ: ০২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের জীবনের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে পরকালীন মুক্তির আশায় ইহকালীন জীবন অতিবাহিত করার মাঝে। ইসলাম কেবল কিছু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক জীবনবিধান, যেখানে মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং অন্তরের প্রশান্তি সমানভাবে গুরুত্ব পায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সুদীর্ঘ নবুয়তি জীবনে বারবার উম্মতকে সতর্ক করেছেন সেই সব চারিত্রিক ত্রুটি সম্পর্কে, যা একজন মানুষকে পরকালে জাহান্নামের ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণীতে জান্নাতি এবং জাহান্নামিদের যে সুস্পষ্ট পার্থক্যের কথা বর্ণিত হয়েছে, তা কেবল তথ্য নয় বরং প্রতিটি মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার এক বিশাল সুযোগ। হারিসাহ ইবনে ওয়াহাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি এই ক্ষেত্রে আমাদের পথের দিশারী, যেখানে জাহান্নামিদের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

জাহান্নামিদের এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের প্রথমটি হলো ‘উতুল’, যার আভিধানিক ও ব্যবহারিক অর্থ হলো রূঢ়, কর্কশ এবং নির্মম স্বভাবের অধিকারী মানুষ। সমাজ জীবনে আমরা অনেকেই দেখি, যারা কথায় এবং আচরণে অত্যন্ত কঠোর। তারা অন্যের কষ্টের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিশীল নয়। এই শ্রেণির মানুষ তাদের চারপাশের মানুষের সাথে নম্র আচরণ করাকে নিজের ব্যক্তিত্বের জন্য অবমাননাকর মনে করে। তাদের হৃদয়ে দয়ার পরিবর্তে কঠোরতার পাথর জমাট বেঁধে থাকে। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে দয়া ও কোমলতার, কারণ আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন দয়ার নবী। তিনি মরুভূমির রুক্ষ জনপদের মানুষের সাথেও যে কোমলতা ও মায়া প্রদর্শন করেছেন, তা ছিল অতুলনীয়। অথচ যারা ‘উতুল’ বা রূঢ় আচরণের মানুষ, তারা এই গুণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে তোলে। তারা অন্যকে ক্ষমা করতে জানে না, বরং প্রতিটা ক্ষেত্রে দম্ভের সাথে কঠোরতা প্রদর্শন করে। এই ধরনের নির্মমতা কেবল সামাজিক সম্পর্কেই ফাটল ধরায় না, বরং মানুষের আত্মাকেও কলুষিত করে তোলে।

জাহান্নামিদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘জাওয়ায’ শব্দটিকে। এই শব্দটির ব্যাখ্যা বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে দিয়েছেন, তবে সবগুলোর সারমর্ম দাঁড়ায় চরম অস্থিরতা ও অভাবের মানসিকতার দিকে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘জাওয়াজ’ এমন এক ব্যক্তি, যে অবিরাম পার্থিব সম্পদ সঞ্চয় করে কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত হক বা যাকাত আদায় করে না। আবার শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.)-এর মতো বড় বড় আলেমদের মতে, এটি এমন এক চরিত্র, যে অত্যন্ত অধৈর্য ও অস্থির। সামান্য বিপদাপদেও সে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং নিজের ওপর আসা যেকোনো সমস্যার জন্য আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। এই শ্রেণির মানুষ সর্বদা তাকদিরের ওপর আপত্তি জানায়। তাদের জীবন অভিযোগের পাহাড় আর হতাশার অন্ধকার দিয়ে ঘেরা। হাদিসের পাতায় আমরা এমন এক সাহসিক যোদ্ধার ঘটনা দেখতে পাই, যে বাহ্যিকভাবে অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করছিলেন, কিন্তু আহত হওয়ার পর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বলেছিলেন, বাহ্যিক আমল অনেক সময় মানুষকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, যদি অন্তরের দৃঢ়তা ও সবর বা ধৈর্য না থাকে। অস্থিরতা মানুষের ইমানকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে স্রষ্টার রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

অহংকার বা দম্ভ হলো জাহান্নামিদের তৃতীয় ও সবচেয়ে মারাত্মক বৈশিষ্ট্য। অহংকার এমন এক ব্যাধি, যা মানুষকে সত্যের পথে আসতে বাধা দেয় এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখায়। প্রিয় নবী (সা.) অহংকারের দুটি বড় পরিণতির কথা বলেছেন—এক, সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং দুই, অন্য মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। অহংকারী ব্যক্তি সব সময় নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। এই শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ তাকে মানুষের প্রতি দয়া ও সম্মান প্রদর্শনের সুযোগ দেয় না। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বারবার বিনয় ও নম্রতার কথা বলেছেন। অহংকারই ছিল ইবলিশের পতনের মূল কারণ। আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করার পেছনে তার মূল শক্তি ছিল দম্ভ। তাই অহংকার শুধু একটি চারিত্রিক দোষ নয়, বরং এটি মানুষের ঈমান ও আমলকে ধ্বংস করার মতো মারাত্মক ব্যাধি। যে ব্যক্তি মনে করে সে অন্যদের চেয়ে উপরে, সে কখনোই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, এই হাদিস আমাদের চরিত্র গঠনের জন্য একটি অনন্য মানদণ্ড। আমরা যদি নিজেকে জাহান্নামের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে চাই, তবে আমাদের রূঢ়তা ত্যাগ করে কোমলতা অবলম্বন করতে হবে, অধৈর্যতা পরিহার করে বিপদে সবর করতে হবে এবং অহংকারের মূলে কুঠারাঘাত করে বিনয়কে জীবনের ভূষণ হিসেবে বেছে নিতে হবে। এই তিনটি বৈশিষ্ট্য—কঠোরতা, অস্থিরতা এবং অহংকার—মানুষকে জাহান্নামের অতল গহ্বরে ঠেলে দেয়। পক্ষান্তরে বিনয়, ধৈর্য এবং কোমলতা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো প্রতিনিয়ত নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং মানুষের প্রতি সদয় থাকা। সব অবস্থায় আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থেকে জীবন যাপন করাই হলো ঈমানের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অন্তরকে পবিত্র রাখুন এবং আমাদের জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com