প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের একদিকে যখন দাবদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন, অন্যদিকে ঠিক সেই সময়েই স্বস্তির বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। আবহাওয়া অধিদফতরের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, বর্তমানে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এর পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে পারে তাপপ্রবাহের তীব্রতা। ফলে প্রখর গরমে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত আবহাওয়া অধিদফতরের নিয়মিত আবহাওয়া বার্তায় দেশের সামগ্রিক আবহাওয়ার একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজশাহী, পাবনা, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা ও খুলনা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ আগামী ২৪ ঘণ্টায় আশপাশের আরও কিছু এলাকায় বিস্তার লাভ করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং মৌসুমি জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রীষ্মের শেষভাগে এমন পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা যায়। একদিকে তীব্র তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অন্যদিকে মৌসুমি বায়ুর আগমনের পূর্ব মুহূর্তে আর্দ্রতার পরিবর্তন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বেশ প্রভাবিত করে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষক এবং বাইরে কর্মরত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অতিরিক্ত গরম বড় ধরনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে আবহাওয়ার এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেও স্বস্তির খবর রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, ঢাকা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের দু-একটি স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানো এবং আকস্মিক ভারি বর্ষণের কারণে জনজীবনে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। খোলা মাঠে অবস্থানকারী কৃষক, নদীপথে চলাচলকারী নৌযান এবং উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত মানুষকে এ সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতি নিয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। বর্তমানে মৌসুমি বায়ু বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে এটি আরও অগ্রসর হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। মৌসুমি বায়ুর পূর্ণ বিস্তার ঘটলে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনই আনে না, এটি দেশের কৃষি অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। আমন ধানের মৌসুম, সবজি চাষ, পুকুর ও জলাধারে পানির সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃপূরণ অনেকাংশেই নির্ভর করে বর্ষাকালের নিয়মিত বৃষ্টিপাতের ওপর। তাই সময়মতো মৌসুমি বায়ুর বিস্তার কৃষকদের জন্যও স্বস্তির বার্তা বহন করে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, বুধবার (১০ জুন) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বৃষ্টিপাতের ফলে সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমে আসতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। যদিও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে, তবে চলমান তাপপ্রবাহ দেশের কিছু কিছু এলাকা থেকে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল, সেখানে বৃষ্টির প্রভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশের আবহাওয়ায় একটি পরিবর্তনশীল ধাপ চলছে। গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ এবং বর্ষার সূচনার মধ্যবর্তী সময়ে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার আচরণ কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কখনও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, কখনও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষের জীবনযাত্রা ও কৃষি ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাসেও ইতিবাচক ইঙ্গিত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, এই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে এবং তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা গরমের তীব্রতা থেকে কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে।
তবে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে জনসচেতনতারও বিকল্প নেই। অতিরিক্ত গরমে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থদের বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। বাইরে বের হলে পর্যাপ্ত পানি পান করা, প্রয়োজন ছাড়া রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা এবং বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদেরও স্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুসরণ করে কৃষিকাজ পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে দেশের মানুষ এখন দুই ধরনের আবহাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। একদিকে তাপপ্রবাহের অস্বস্তি, অন্যদিকে মৌসুমি বায়ুর অগ্রযাত্রায় বৃষ্টির সম্ভাবনা। প্রকৃতির এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বর্ষার পূর্ণ উপস্থিতির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আর সেই প্রত্যাশায় প্রখর রোদের নিচে ক্লান্ত মানুষের চোখ এখন আকাশের মেঘের দিকে, অপেক্ষা এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টির।