প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় করা প্রতারণা ও চাঁদাবাজির একটি মামলায় আলোচিত মডেল মেঘনা আলমের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো উপাদান রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এই নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এম এ আজহারুল ইসলাম, মঙ্গলবার সকালে মামলার শুনানি শেষে।
এদিন সকাল ১১টায় মেঘনা আলম নিজে আদালতে উপস্থিত হন পাসপোর্ট, আইফোন-১৬ প্রো, ম্যাকবুক, একটি অপো মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ফেরত চেয়ে। তাকে দেখা যায় হাতে খেজুরের একটি কার্টুন ও জায়নামাজ নিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে। তার পক্ষে আইনজীবী মহিমা বাঁধন ও মহসিন রেজা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন এবং দাবি করেন, মেঘনা আলম একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের লিডারশিপ ট্রেইনার, যিনি প্রায়ই বিদেশ সফরে যান। তাই তার প্রযুক্তি ডিভাইসগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং ফেরত দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. হারুন অর রশিদ এই আবেদনকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করে বলেন, আসামি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি কূটনীতিক ও দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করে আসছেন। তিনি দাবি করেন, আসামির মোবাইল ও ল্যাপটপ তদন্ত সাপেক্ষে জানতে হবে, তিনি কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, কাদের ব্ল্যাকমেইল করেছেন এবং কার কার সঙ্গে গোপন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে মামলাটিকে একটি ‘চাঞ্চল্যকর প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইল চক্রের’ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শুনানির সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘনা আলম নিজেই সরব হন এবং আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমার সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতসহ অনেক বিদেশি কূটনীতিকের পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে। বরং সৌদি রাষ্ট্রদূতই আমাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিলেন এবং সেই সম্পর্কের যথেষ্ট প্রমাণ আমার কাছে আছে।” তবে বিচারক সঙ্গে সঙ্গে এই বক্তব্য থামিয়ে দেন এবং বলেন, “এখন এটি আলোচনার বিষয় নয়।”
পরবর্তী বক্তব্যে মেঘনা বলেন, “বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আজ আমি তুলে ধরছি। আমি ছয়টি মহাদেশের দশটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছি। আমি নারীদের অধিকার রক্ষায়ও কাজ করেছি। আমার মোবাইল, ল্যাপটপ, পাসপোর্ট আমাকে ফেরত দেওয়া হোক।” তবে রাষ্ট্রপক্ষ তার দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আসামির কর্মকাণ্ড এজাহারেই পরিষ্কার এবং তিনি নারীদেরকে ব্যবহার করে বিদেশিদের ব্ল্যাকমেইল করতেন। তখন মেঘনা পাল্টা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “আপনি রাষ্ট্রদূতকে অসম্মান করছেন”।
উভয় পক্ষের তর্কাতর্কির মধ্যেই শুনানি শেষ হয়। আদালত এরপর আদেশ দেন যে, মেঘনা আলমের জব্দকৃত মোবাইল ফোন, ম্যাকবুক ও ল্যাপটপে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো তথ্য বা উপাদান রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ডিভাইসের প্রকৃত মালিকানা যাচাই করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মেঘনা আলম, দেওয়ান সমির এবং আরও ২-৩ অজ্ঞাত ব্যক্তি মিলে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র গঠন করেছেন। তারা বিভিন্ন আকর্ষণীয়, স্মার্ট নারীকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিক ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে, অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পরে তাদের সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন।
দেওয়ান সমির সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি কাওয়াই গ্রুপের সিইও এবং সানজানা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ম্যানপাওয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার আরও একটি প্রতিষ্ঠান ছিল—মিরআই ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে নারীদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বানিয়ে বিদেশি ও ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে, গত ১০ এপ্রিল বিশেষ ক্ষমতা আইনে মেঘনা আলমকে ৩০ দিনের জন্য আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে ওই আটকাদেশ বাতিল হয় এবং ১৭ এপ্রিল ধানমণ্ডি থানার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৮ এপ্রিল আদালত থেকে তিনি জামিন পান।
এখন অপেক্ষা, তদন্তে মেঘনা আলমের ডিভাইসে আদৌ কোনো রাষ্ট্রবিরোধী উপাদান পাওয়া যায় কি না এবং মামলার ভবিষ্যৎ মোড় কোন দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন