প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দিতে হবে। এই সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি ঢাকাকে চিঠি পাঠিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এনসিবি আবুধাবি। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ অনুযায়ী বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে দুবাই ট্রানজিট থেকে আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তিনি লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনসিবি আবুধাবি থেকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের তথ্য পেয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোলের কাছে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ করেছিল। পরে ইন্টারপোল সেই নোটিশ জারি করে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
বেনজীর আহমেদ একসময় বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। তিনি পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে থাকা এই সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় আসে। দুদকের মামলার পর তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।
তার গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ তাকে কত দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে পারবে। কারণ বিদেশ থেকে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন বাংলাদেশকে সেই প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ধাপ শুরু করতে বলেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নম্বর A-5174/4-2025 অনুযায়ী বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হয়। আদালত দেশটির ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়। এই আইনি কাঠামোর অধীনেই বাংলাদেশকে প্রত্যর্পণের আবেদন করতে হবে।
প্রত্যর্পণ আবেদন একটি সাধারণ চিঠি নয়। এতে অভিযোগ, মামলার আইনি ভিত্তি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্তের নথি এবং আসামির পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে দিতে হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনি নিয়ম অনুযায়ী, এসব নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে জমা দিতে হবে। নথিতে যথাযথ স্বাক্ষর, সিলমোহর এবং কূটনৈতিক অনুমোদন থাকতে হবে। তাই বাংলাদেশকে দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে থাকবে অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্ণ নাম, পরিচয়, ছবি, জাতীয়তা এবং আবাসন সংক্রান্ত তথ্য। আরও থাকতে হবে যে অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই অপরাধের বাংলাদেশের আইনি ধারা, সর্বোচ্চ শাস্তি এবং প্রযোজ্য সীমাবদ্ধতার বিধান। এছাড়া বাংলাদেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষের জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি দিতে হবে।
মামলার ঘটনার বিবরণও গুরুত্বপূর্ণ। কখন, কোথায়, কীভাবে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপিও জমা দিতে হবে। যদি কোনো মামলায় আসামি আগে থেকেই সাজাপ্রাপ্ত হন, তাহলে আদালতের রায় এবং সাজা কার্যকরের আনুষ্ঠানিক কপিও দিতে হবে। তবে বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে মামলার বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী কোন কোন নথি লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও কূটনৈতিক চ্যানেল ঠিক করবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এটি মূলত সদস্য দেশগুলোর কাছে একজন পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত ও সাময়িকভাবে আটক করার অনুরোধ। তাই রেড নোটিশে গ্রেপ্তার হলেও কাউকে সরাসরি অন্য দেশে পাঠানো যায় না। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও সরকারের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও তাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত, আইন মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই সময়সীমা শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনি দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। আবেদন দেরিতে গেলে বা নথিতে ঘাটতি থাকলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। এমনকি আসামিপক্ষও আদালতে নানা আইনি যুক্তি তুলতে পারে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, এনসিবি ঢাকা এবং দুদককে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানো গেলে এটি দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়ায় বড় নজির হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অনেক আলোচিত মামলার আসামি বিদেশে অবস্থান করে থাকেন। তাদের ফিরিয়ে আনা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো নথিপত্রের দুর্বলতা, কখনো প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা, কখনো আবার বিদেশি আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে এসব উদ্যোগ সফল হয় না। তাই এই ঘটনা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
দুদকের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যে মামলার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই মামলার তদন্ত ও অভিযোগের নথি বিদেশি আদালতের সামনে গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে। শুধু রাজনৈতিক আলোচনায় অভিযোগ থাকলেই হবে না। আদালতে প্রমাণ, আইনি ধারা এবং তদন্তের যুক্তি পরিষ্কার হতে হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ দেখবে, অভিযোগটি তাদের আইনের দৃষ্টিতে প্রত্যর্পণযোগ্য কি না।
অন্যদিকে বেনজীর আহমেদও আইনি প্রতিরক্ষা নিতে পারবেন। তিনি চাইলে আমিরাতের আদালতে প্রত্যর্পণ আবেদনের বিরুদ্ধে যুক্তি দিতে পারেন। তার আইনজীবীরা মামলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অভিযোগের প্রকৃতি বা নথির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাই বাংলাদেশকে এমনভাবে আবেদন প্রস্তুত করতে হবে, যেন তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে টিকে থাকে।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। কারণ বেনজীর আহমেদ ছিলেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পদে থাকা একজন কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই মানুষ জানতে চেয়েছে, আইন সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে কি না। দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা গেলে জনআস্থার জায়গায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে দোষী নন। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং এখন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার কথা উঠেছে। কিন্তু আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া তাকে অপরাধী বলা যাবে না। তাই এই পুরো ঘটনাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
বাংলাদেশ এখন আমিরাতের চিঠির জবাবে কত দ্রুত আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠায়, সেটিই দেখার বিষয়। আবেদন পাঠানোর পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পর্যালোচনা করবে। এরপর সিদ্ধান্ত হবে, বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না।
সব মিলিয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাই গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরীক্ষা। এটি শুধু একজন সাবেক কর্মকর্তাকে দেশে ফেরানোর বিষয় নয়। এটি দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ, অনুবাদিত ও আইনসম্মত নথি পাঠানো। কারণ এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপই ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করতে পারে।