মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোশারফ হোসেনের প্রস্থান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্ররাজনীতি এবং জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি যে পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন, তা তাঁকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত ১টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। পরিবার, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং শুভানুধ্যায়ীরা শেষ পর্যন্ত তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করলেও জীবনের দীর্ঘ পথচলার ইতি টানেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর এলাকায় শোকের আবহ সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই স্মৃতিচারণ করে শোক প্রকাশ করেন।

রোববার বাদ আসর লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বস্তরের মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

মোশারফ হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি জয় বাংলা বাহিনী বা বিএলএফ-এর নোয়াখালী ও হাতিয়া অঞ্চলের জোনাল কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। যুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠন গড়ে তোলা, তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম সমন্বয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে সহযোদ্ধারা স্মরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের আগেও তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বগুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।

রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় তিনি নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী ছিলেন। রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। বয়সের ভার এবং শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন থেকে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যদিও নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি, তবুও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর সক্রিয়তা অব্যাহত ছিল।

তাঁর মৃত্যুর খবরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান শোক প্রকাশ করে বলেন, মোশারফ হোসেন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি।

বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন, কমলনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারাকাত দুলাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ, রামগতি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন এবং কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা পৃথক শোকবার্তা দিয়েছেন।

শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, স্থানীয় সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। কমলনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি এম এ মজিদ এবং সাধারণ সম্পাদক মুছাকালিমুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেন, মোশারফ হোসেন ছিলেন গণমানুষের নেতা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডও মানুষের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী এবং সহজ-সরল স্বভাবের মানুষ। স্থানীয়দের অনেকেই স্মরণ করেন, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার কারণে তিনি ভিন্নমতের মানুষের কাছেও সম্মানিত ছিলেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের জীবন কেবল রাজনৈতিক পদ বা পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মোশারফ হোসেন ছিলেন তাঁদেরই একজন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের আসন পর্যন্ত তাঁর পথচলা ছিল সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ এবং জনসেবার এক দীর্ঘ অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে একটি প্রজন্মের স্মৃতি, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

তবে একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর আদর্শ বা অবদানকে শেষ করে দিতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ছাত্রনেতা, সংসদ সদস্য এবং জননেতা হিসেবে মোশারফ হোসেনের অবদান ভবিষ্যতেও স্মরণ করা হবে। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জনকল্যাণে নিবেদিত এই প্রবীণ রাজনীতিকের বিদায়ে জাতি আজ গভীরভাবে শোকাহত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত