স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে ইসির প্রস্তুতিতে ঘাটতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া, প্রয়োজনীয় নির্বাচনি সামগ্রীর ঘাটতি এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত থাকায় সামগ্রিক প্রস্তুতি কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মোট ৮৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮টি নির্বাচনি সামগ্রীর প্রয়োজন হবে। বর্তমানে কমিশনের মজুত রয়েছে প্রায় ৫৯ লাখ দুই হাজার সামগ্রী। ফলে প্রায় ২৪ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি সামগ্রী ঘাটতি রয়েছে, যা চূড়ান্ত যাচাইয়ে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি অনেকটাই নির্ভর করে সরকারের সময়সূচি নির্ধারণের ওপর। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন পর্যায় থেকে নির্বাচন শুরু হবে এবং কবে অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না আসায় কেনাকাটার সিদ্ধান্তও ঝুলে আছে। এতে করে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি হয়েছে।

এর আগে কমিশনের পক্ষ থেকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কেনা সামগ্রী পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ব্যবহার করা যাবে। এতে নতুন করে বড় ধরনের কেনাকাটার প্রয়োজন পড়বে না বলে মনে করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা যাচাইয়ের সময় দেখা যায়, বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আলাদা করে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন সামগ্রী কেনা একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বিশেষ করে অমোচনীয় কালির কলমের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সরবরাহ মিলিয়ে অন্তত তিন মাস সময় লাগে। নির্বাচন সময়সূচি নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই এসব ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে কমিশন।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য পরিকল্পনায় প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের কথা রয়েছে।

একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাজেট ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে প্রথম ধাপের নির্বাচন সীমিত আকারে শুরু হতে পারে।

সরকার ও ইসি সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের শেষদিকে সীমিত পরিসরে একটি পরীক্ষামূলক নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা নির্বাচন—এই দুইটির যেকোনো একটি দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে নির্বাচনি বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া। নির্বাচন কমিশনের প্রণীত আচরণ বিধিমালার খসড়া বর্তমানে অংশীজনদের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত মতামত গ্রহণ করা হবে। এরপর সেগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।

একইভাবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার কাজও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে ভোট আয়োজন করতে হলে আগস্টের মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু বিধিমালা চূড়ান্ত না হলে তফসিল ঘোষণা করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে অমোচনীয় কালির কলম, স্ট্যাম্প প্যাড, অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিল, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক, হেসিয়ান ব্যাগ, গানি ব্যাগ এবং লাল গালা ইত্যাদি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লকে। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় চার লাখের বেশি কম রয়েছে এই সামগ্রীটি।

এছাড়া মার্কিং সিল, অফিসিয়াল সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, ব্রাস সিল এবং ব্যাগজাতীয় সরঞ্জামেও ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে অমোচনীয় কালির কলমের চাহিদা ও মজুতের মধ্যে ব্যবধান থাকায় এটি নির্বাচন প্রস্তুতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ইসি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সাধারণত একদিনে অনুষ্ঠিত হয় এবং একযোগে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়ায় চাহিদার ধরন আলাদা হলেও সামগ্রিক প্রস্তুতি সমান গুরুত্ব বহন করে।

প্রস্তুতির এই ঘাটতি এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো বিধিমালা চূড়ান্ত করা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে একদিকে যেমন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। এখন নজর রয়েছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং কমিশনের দ্রুত পদক্ষেপের দিকে, যা আগামী নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত