তাজিয়া মিছিলে হামলার শঙ্কা নেই: ডিএমপি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র আশুরা উদযাপন ও তাজিয়া মিছিল ঘিরে কোনো হামলার শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার সকালে পুরান ঢাকার হোসাইনী দালানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কা না থাকলেও রাজধানীতে আশুরা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদভাবে পালনের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, আশুরা উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা, তাজিয়া মিছিলের পথ এবং অনুষ্ঠানস্থলগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। ড্রোন ও সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। এরই মধ্যে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও কেনাইন ইউনিট দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল সুইপিং করা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল, কেনাইনসহ বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত থাকবে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মানুষের শান্তি, শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না হয়, সেদিকে পুলিশ সতর্ক থাকবে। মিছিলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিএমপি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। গোয়েন্দা নজরদারিও থাকবে।

হোসাইনী দালান পুরান ঢাকার শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। আশুরার তাজিয়া মিছিল ঘিরে প্রতি বছর এখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। ধর্মীয় শোক, স্মরণ ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এ মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক দিয়ে বের হয়। তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পথ ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা এবং জনসাধারণের চলাচল নিয়েও পুলিশের আলাদা প্রস্তুতি থাকে।

ডিএমপি কমিশনার জানান, তাজিয়া মিছিলে নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হতে পারবে না। মিছিলে দাহ্য পদার্থ, ধারালো অস্ত্র বা আঘাত করতে পারে এমন কোনো বস্তু বহন করা যাবে না। দা, ছুরি, কাস্তে, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি বা এ ধরনের কোনো জিনিস নিয়ে মিছিলে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তাজিয়া মিছিলে ঢাকঢোল বা উচ্চ শব্দের কোনো যন্ত্র রাখা যাবে না। পুলিশের ভাষ্য, উচ্চ শব্দ ভিড়ের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা বাড়ে। তাই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব বিষয়ে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আশুরা মুসলিম বিশ্বের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শিয়া মুসলিমরা তাজিয়া মিছিলসহ নানা ধর্মীয় আচার পালন করেন। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে আশুরা উপলক্ষে পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শোক মিছিল বের হয়। এসব আয়োজনে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যও যুক্ত থাকে।

তবে বড় জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বও বেশি। বিশেষ করে অতীতে আশুরার মিছিল ঘিরে হামলার ঘটনা মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। তাই প্রতি বছর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাড়তি সতর্কতা নেয়। ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন আছে। তিনি বলেছেন, হামলার কোনো শঙ্কা নেই। তবু সতর্কতা ও প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না।

চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় মিছিলের পথ, প্রবেশপথ, অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে। সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যরা মানুষের ভিড়ের মধ্যে নজরদারি করবেন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট থাকবে। সন্দেহজনক ব্যাগ, বস্তু বা চলাচল নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিছিলের আগে অনুষ্ঠানস্থল সুইপিং করা নিরাপত্তা প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বিস্ফোরক জাতীয় কোনো বস্তু আছে কি না, তা পরীক্ষা করে। কেনাইন ইউনিট প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরীক্ষা করে। এতে বড় আয়োজনের আগে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো যায়। ড্রোন ও সিসিটিভি নজরদারি ভিড়ের গতিবিধি বুঝতেও সহায়তা করে।

ডিএমপি সাধারণ মানুষকে পুলিশের নির্দেশনা মানার আহ্বান জানিয়েছে। মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া মিছিলের রুট পরিবর্তন করা যাবে না। কেউ যেন গুজব ছড়াতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভুয়া তথ্য দেখলে তা যাচাই না করে ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

রাজধানীতে আশুরার মিছিলের কারণে কিছু সড়কে যান চলাচলে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই নগরবাসীকে সময় হাতে নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিছিলের রুটের আশপাশে অপ্রয়োজনীয় ভিড় না করার কথাও বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে পুলিশ সদস্যদের সহায়তা নেওয়া যাবে।

ধর্মীয় আয়োজনের নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়। আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক, অংশগ্রহণকারী এবং সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। কেউ যেন নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ে মিছিলে ঢুকতে না পারে, সে বিষয়ে আয়োজকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। ভিড় বেশি হলে ধাক্কাধাক্কি বা আতঙ্ক যেন না ছড়ায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যে একটি আশ্বাস স্পষ্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন, সেগুলো মেনে চলা জরুরি। কারণ বড় ধর্মীয় আয়োজনে ছোট ভুলও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে আতশবাজি, পটকা, উচ্চ শব্দ, ধারালো বস্তু বা দাহ্য পদার্থ মানুষের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় মিছিল হলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়। সরু রাস্তা, পুরোনো স্থাপনা, দোকানপাট এবং মানুষের বেশি উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরও সতর্কভাবে করতে হয়। হোসাইনী দালান এলাকায় তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও আয়োজক কমিটির মধ্যে সমন্বয় থাকলে মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করা সহজ হবে।

আশুরা উপলক্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। তাই কোনো উসকানি, গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচার যেন সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট না করে, সে বিষয়ে সবার সতর্ক থাকা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ ধরনের প্রচার নজরদারিতে রাখবে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে তাজিয়া মিছিল ঘিরে ডিএমপির বার্তা হলো, আতঙ্কের কোনো কারণ নেই, তবে সতর্কতা থাকবে সর্বোচ্চ। হামলার সুনির্দিষ্ট শঙ্কা না থাকলেও রাজধানীতে চার স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। ড্রোন, সিসিটিভি, বোম্ব ডিসপোজাল, কেনাইন, সোয়াট ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আশুরার আয়োজন নিরাপদ রাখতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের নির্দেশনা মেনে চললে এবং আয়োজক-অংশগ্রহণকারীরা সহযোগিতা করলে পবিত্র আশুরার তাজিয়া মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছে ডিএমপি। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখাই এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com