সর্বশেষ :
রাজধানীতে অভিযান, ডিএমপির তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি মোশারফ গ্রেফতার ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, বাসের চাপায় প্রাণ গেল যুবকের ১২ বছর ধরে অচল একটি সেতু, দুর্ভোগে কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত, আশাবাদ সরকারের বোয়ালমারীতে মাদক কারবারির সন্দেহে গণপিটুনি, ক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল প্রাইভেটকার এক মাসে চারবার ভূমিকম্প, বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত নাকি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া? চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত আদালতের চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তির সম্ভাবনা আওয়ামী লীগের মাঠে নামার সাহস নেই: জাহেদ

চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তির সম্ভাবনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডি আয়োজিত জাতীয় বাজেট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক আলোচনায় তিনি এ কথা জানান।

চিফ হুইপ বলেন, সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে চায়। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে সামনে রেখে নীতি সহায়তা, কর-সুবিধা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার কাজ চলছে। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে এই খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে সরকার জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর ছাড় দিয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভর্তুকি সহায়তাও অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। তাই সরকার একদিকে ভর্তুকি দিয়ে চাপ কমাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প শক্তির উৎস বাড়ানোর পথে হাঁটছে।

তিনি জানান, জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে অচিরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরও বিস্তৃত কর-সুবিধা ঘোষণা করা হতে পারে। এতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, গ্রিড সংযোগ, ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প এবং বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন গতি আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন বড় রূপান্তরের মুখে। একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে আমদানি করা জ্বালানি, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ এবং জলবায়ু ঝুঁকি সরকারকে নতুন পরিকল্পনা নিতে বাধ্য করছে। তাই সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস নিয়ে আলোচনা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

চিফ হুইপ বলেন, টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প শক্তির উৎস ব্যবহারে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। তার মতে, শুধু সরকারি প্রকল্প দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য পূরণ করা যাবে না। বেসরকারি খাতকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।

সরকারি ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনার কথাও জানান নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবে সরকারি ভবনগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। খুব শিগগিরই এর সুফল দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল বসানো হলে কয়েকটি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। দিনের বেলায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব উৎস থেকে পাওয়া যাবে। গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। সরকারি দপ্তরের বিদ্যুৎ বিলও কমতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও বেসরকারি খাতের কাছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে এরই মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সমকালসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। আলোচনায় তিস্তা প্রকল্পসহ অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতের বিষয় থাকতে পারে।

চীন বর্তমানে বিশ্বে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, গ্রিড প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের অন্যতম বড় উৎপাদক। তাই বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এমন সহযোগিতায় ঋণের শর্ত, স্থানীয় শিল্পের অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো পরিষ্কার করা জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনাময় হলেও বাস্তবায়নে কিছু বড় বাধা রয়েছে। জমির স্বল্পতা, গ্রিড সংযোগের সীমাবদ্ধতা, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যয়, প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া কঠিন। তাই ছাদভিত্তিক সোলার, শিল্পকারখানার ছাদ, সরকারি ভবন, রেলস্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং খালি সরকারি জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সিপিডির আলোচনায় জাতীয় বাজেট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির বিষয়টি সামনে আসে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সিপিডি বলেছে, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বড় ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব রয়েছে, যা আগের সংশোধিত বাজেটের ৩৬ হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি।

এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার শুধু পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি খরচও স্থিতিশীল হতে পারে। তবে শুরুতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং নীতি সহায়তা দরকার হবে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর ছাড় বা প্রণোদনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কর ছাড় যথেষ্ট নয়। দরকার দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা, ব্যাংক ঋণে সুবিধা, মানসম্মত যন্ত্রাংশের নিশ্চয়তা, গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির সহজ নিয়ম এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির স্বচ্ছতা। এসব না থাকলে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চান না।

বাংলাদেশের শিল্প খাতও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য কারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার ব্যবস্থা বসালে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারে সবুজ উৎপাদনের ভাবমূর্তিও শক্ত হতে পারে।

নুরুল ইসলাম মনির বক্তব্যে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতার বিষয়টি বিশেষভাবে এসেছে। বাংলাদেশ এখনো গ্যাস, এলএনজি, তেল, কয়লা এবং আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে এর চাপ পড়ে বাজেট, বিদ্যুৎ বিল এবং শিল্প উৎপাদনে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তার প্রশ্ন।

তবে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বাস্তববাদী পরিকল্পনা দরকার। সূর্যের আলো দিনে পাওয়া যায়। রাতে বিদ্যুৎ দিতে হলে ব্যাটারি বা অন্য উৎস দরকার। আবার মেঘলা আবহাওয়া, বর্ষাকাল এবং গ্রিডের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাই সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যদি সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে চুক্তি হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় বার্তা দেবে। তবে চুক্তির ধরন কী হবে, অর্থায়ন কেমন হবে, প্রকল্প কোথায় হবে, প্রযুক্তি স্থানান্তর থাকবে কি না এবং দেশীয় কোম্পানির অংশগ্রহণ কতটা থাকবে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বড় ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনাই হবে আসল পরীক্ষা।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ একসঙ্গে খোলা রাখতে হবে। প্রথমত, বিদ্যমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে হবে, যাতে মানুষ ও শিল্প খাত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায়। দ্বিতীয়ত, ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের জ্বালানি খরচ ও আমদানি নির্ভরতা কমে।

চিফ হুইপের বক্তব্য সেই দ্বিতীয় পথের দিকেই ইঙ্গিত করছে। সরকার যদি সত্যিই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর-সুবিধা বাড়ায়, সরকারি ভবনে সোলার বাস্তবায়ন করে এবং চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা গড়ে তোলে, তাহলে সৌরবিদ্যুৎ খাত নতুন গতি পেতে পারে। তবে স্বচ্ছ নীতি, প্রতিযোগিতামূলক দর এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ চুক্তি শুধু একটি কূটনৈতিক দলিল নয়। এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সবুজ, সাশ্রয়ী ও টেকসই পথে নেওয়ার সুযোগ হতে পারে। এখন নজর থাকবে সফরের ফলাফলের দিকে। চুক্তি হলে তার বাস্তব রূপ কত দ্রুত দেখা যায়, সেটিই হবে আসল প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত