মালদ্বীপে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণ আরও সহজ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার এবং বাংলাদেশ মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (বিএমএল)-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বৈঠকে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা ও কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী আয় প্রেরণে সময় কমানো, লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং নিরাপদ ডিজিটাল রেমিট্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। বৈঠকে উভয় পক্ষই মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় দ্রুত ও স্বচ্ছ রেমিট্যান্স সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা নিয়মিতভাবে দেশে রেমিট্যান্স পাঠালেও অনেক সময় উচ্চ ফি, দেরি এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের কারণে সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় মুদ্রা (মালদ্বিভিয়ান রুফিয়া) ভিত্তিক রেমিট্যান্স ব্যবস্থা চালু করা হলে লেনদেন আরও সহজ হবে বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ হাইকমিশনার বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই তাদের জন্য আধুনিক, নিরাপদ এবং কম খরচে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা চালু হলে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ দুই-ই সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেল নিরুৎসাহিত হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বচ্ছতা বাড়াবে।
বিএমএল প্রধান বৈঠকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল রেমিট্যান্স সিস্টেম সম্প্রসারণে কাজ করছে এবং মালদ্বীপের ব্যাংকিং ও এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি দ্রুতগামী পেমেন্ট গেটওয়ে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় মুদ্রায় রেমিট্যান্স প্রেরণের ব্যবস্থা চালু হলে প্রবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ প্রেরণ ও গ্রহণ করতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী কমে যাবে এবং লেনদেন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয় মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবস্থার সংযোগ নিয়েও। উভয় পক্ষই মনে করেন, আধুনিক ফিনটেক প্রযুক্তির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মালদ্বীপে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যারা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। যদি এই রেমিট্যান্স ব্যবস্থা আরও সহজ করা যায়, তাহলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় মুদ্রায় রেমিট্যান্স ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো লেনদেনের গতি বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করা। এতে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে।
এদিকে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্তমানে অনেক প্রবাসী জটিল প্রক্রিয়া ও উচ্চ চার্জের কারণে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে, যার মাধ্যমে প্রথম ধাপে নির্দিষ্ট ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় রেমিট্যান্স লেনদেন শুরু করা যাবে।
সব মিলিয়ে, মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের জন্য স্থানীয় মুদ্রায় রেমিট্যান্স ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী আয় প্রেরণ আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।