প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে তেহরানের প্রকাশ্য অস্বীকৃতিকে ‘পারস্যের দর কষাকষির কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ এখনো খোলা রয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘দ্য মাইকেল নোলস শো’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় কারিগরি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তার দাবি, নির্ধারিত বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
ভ্যান্স বলেন, “আমাদের মধ্যে ইতোমধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই মূলত কারিগরি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। সেগুলো আগামীকাল অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে।” তবে একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠক বা শান্তি আলোচনার অস্তিত্ব অস্বীকার করায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তারা একদিকে প্রযুক্তিগত আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করছেন, অন্যদিকে এটিকে শান্তি আলোচনা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইছেন না। তিনি মনে করেন, তেহরানের এই অবস্থান কূটনৈতিক দর কষাকষির একটি পরিচিত কৌশল।
ভ্যান্স বলেন, “তারা বলছে, কোনো শান্তি আলোচনা চলছে না, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি নিয়ে কারিগরি আলোচনা চলছে। এটি ফার্সিদের এক ধরনের দর কষাকষির কৌশল এবং এমন বাগাড়ম্বরপূর্ণ ভাষা, যা আমি বুঝতে পারি না।”
তার মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের বক্তব্যের চেয়ে তাদের বাস্তব পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে তেহরানের কাছ থেকে বাস্তব ও কার্যকর ছাড় আশা করছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আলোচনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ইতিবাচক সংকেত দেখতে পাচ্ছে, তবে একই সঙ্গে কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তার মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে, কিন্তু সফলতা নির্ভর করবে ইরান কতটা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
ভ্যান্স বলেন, “আমরা অবশ্যই কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখছি। আবার কিছু নেতিবাচক লক্ষণও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করতে, আলোচনা কোন দিকে এগোয় তা দেখতে এবং কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব কি না তা যাচাই করতে। তবে প্রয়োজন হলে আমাদের হাতে অন্য অনেক বিকল্পও রয়েছে।”
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরান কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করেছে। এরপর হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার দোহায় সফর করেন। তাদের এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ধারণা তৈরি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতার উদ্যোগ শুরু হতে পারে।
তবে পরে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দোহায় ইরানি প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈঠক হবে না। ইরান জানায়, তারা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দোহায় অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার মূল বিষয় হবে একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন। এর মধ্যে কাতারের কাছে থাকা ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্তির বিষয়টিও রয়েছে।
তেহরানের এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, ইরান সরাসরি রাজনৈতিক বা শান্তি আলোচনার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কারিগরি ও বাস্তব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে বৃহত্তর কূটনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখছে।
এদিকে, একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি নিয়ে আঞ্চলিক সংলাপ অব্যাহত রাখতে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার দোহায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল-থানি এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করা সহজ হবে না। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী। তবে সাম্প্রতিক যোগাযোগগুলো দেখাচ্ছে, উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দোহা আলোচনা সরাসরি কোনো বড় চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর। ইরান যেমন নিজের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাইছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দোহাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, নাকি এটি কেবল আরেক দফা আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আগামী দিনের আলোচনাই এর উত্তর দেবে।