রেকর্ড গড়ে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স: অর্থনীতিতে নতুন গতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
রেকর্ড গড়ে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স: অর্থনীতিতে নতুন গতি

প্রকাশ:  ১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অদম্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা আবারও প্রমাণ করলেন যে, তারা দেশের অর্থনীতির আসল প্রাণশক্তি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং নানামুখী প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই অর্জন ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। প্রবাসীদের পাঠানো এই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে কেবল শক্তিশালীই করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট মোকাবিলায় এক বিশাল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থবছরজুড়ে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করেছে। গত অর্থবছরের রেকর্ডের পর এবার প্রবাসীরা যেভাবে দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাসের পর মাস প্রবাসীরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিয়ে গেছেন, যা দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।

বিদায়ী জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি সামান্য কম, তবুও পুরো অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্র বেশ ইতিবাচক। দেশের ইতিহাসে কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে এই পরিমাণ প্রবাসী আয় আসা ছিল অকল্পনীয়। মে মাসে দেশে এসেছিল ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাসী আয়। এর আগে মার্চ মাসে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স আসার রেকর্ড ছিল, যা দেশের ইতিহাসের যেকোনো এক মাসের জন্য সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

প্রবাসীদের এই অসামান্য অবদানের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো গল্প। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র দাবদাহে বা ইউরোপ-আমেরিকার কনকনে ঠান্ডায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে অর্থ তারা দেশে পাঠান, তা কেবল কিছু সংখ্যা নয়; এটি দেশের কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার সংস্থান। প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে আছে একজন প্রবাসী ভাইয়ের চোখের জল এবং পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তারা বিদেশে থেকেও দেশের জন্য যে টান অনুভব করেন, তার বহিঃপ্রকাশই ঘটছে এই বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের অর্থনীতির সেই রক্ত সঞ্চালনের কাজ করে, যা দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক।

অর্থবছরের প্রতিটি মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবাসীরা ধারাবাহিকভাবে তাদের আস্থার পরিচয় দিয়ে গেছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০২ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া বছরের শুরুর দিকের মাসগুলোতেও প্রবাহের গতি ছিল সন্তোষজনক। কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত এই অর্থ যখন দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে, তখন তা দেশের অর্থনীতিকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দেয়। রিজার্ভ বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আস্থার জায়গাটি আরও সুদৃঢ় হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

তবে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা আরও সহজতর করার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে। তারা যেন খুব সহজে, স্বল্প সময়ে এবং কম খরচে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সে জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে হুন্ডির মতো অবৈধ পথের পরিবর্তে বৈধ পথে টাকা পাঠানোর ব্যাপারে প্রবাসীদের সচেতনতা বাড়ছে। এর পেছনে সরকারি প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসীদের এই আস্থা ধরে রাখতে পারলে আগামী দিনগুলোতে এই রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের এই জোয়ার কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক সাফল্য নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লবও বটে। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থে গ্রামে গ্রামে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, বেকার সন্তানরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে এবং সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। এক কথায়, প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থই গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কোনো এক প্রবাসীর পাঠানো অর্থে তার ভাই কলেজে পড়ছে, আবার কোনো এক প্রবাসীর আয়ে তার বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ মেটানো হচ্ছে। এভাবে পুরো দেশের প্রতিটি পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রেমিট্যান্সের সুফল ভোগ করছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতার মধ্যেও প্রবাসীদের এই সাফল্য দেশের জন্য আশীর্বাদ। যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশের এই রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। প্রবাসীরাই দেশের প্রকৃত বীর, যারা সব সময় দেশের বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসেন। তারা তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের এই অর্জন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক। তবে এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের কর্মসংস্থান ও অধিকার রক্ষা করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। প্রবাসীদের যথাযথ মর্যাদা এবং তাদের আস্থার প্রতিদান দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা, প্রবাসীরা যেন এভাবেই দেশের অর্থনীতির হাল শক্ত করে ধরে রাখেন এবং আগামী দিনে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত