জামায়াতের গঠনতন্ত্রে বড় পরিবর্তন: আসছে ১৪ সংশোধনী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
জামায়াতের গঠনতন্ত্রে বড় পরিবর্তন: আসছে ১৪ সংশোধনী

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নতুন ধারায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটি নিজেকে নতুন করে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছরের ব্যবধান পেরিয়ে এবার জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। দলটির অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গঠনতন্ত্রের প্রায় ১৪টি ধারায় সংশোধন আনার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং দলীয় কাঠামোর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দলীয় বিশ্বস্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমান আমিরের অর্ধযুগের নেতৃত্বকালে এটিই হতে যাচ্ছে দলের গঠনতন্ত্রে সবচেয়ে বড় ও ব্যাপকভিত্তিক সংশোধনী। দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম মজলিসে শুরায় ইতোমধ্যে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় অর্জিত রাজনৈতিক শিক্ষা এবং বর্তমান সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে সংগঠনের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিতামূলক করে তোলাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি স্তরের প্রতিনিধিদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গঠনতন্ত্রের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৬৮ নম্বর ধারায় সংশোধনী আনার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এই ধারায় নতুন উপধারা যুক্ত করার মাধ্যমে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের আমিরদের আর্থিক ব্যয়ের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রায়ই নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে, যা নিরসনে জামায়াতের এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর পাশাপাশি একই অধ্যায়ে দলের আয়ের উৎস সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও বিস্তারিত বর্ণনা সংযোজন করা হচ্ছে। দলটির উদ্দেশ্য হলো, প্রতিটি পয়সা যেন যথাযথভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে ব্যয় হয়, যা নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সামনে দলের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।

আর্থিক শৃঙ্খলার বাইরেও গঠনতন্ত্রের তৃতীয় অধ্যায়ে আমূল পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা জামায়াতের দীর্ঘদিনের প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই পরিষদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শুধু দলের নিবেদিতপ্রাণ সদস্যরাই নন, বরং দলের সাথে সরাসরি যুক্ত নন কিন্তু দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ও গুণী ব্যক্তিদেরও স্থান দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। দেশের নীতি-নির্ধারণী পরামর্শ এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও সমৃদ্ধ ও যৌক্তিক করার লক্ষ্যেই এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা হচ্ছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বিস্তারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে গিয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত মজলিসে শুরা বৈঠকের মাধ্যমে তারা ২৩তম সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। দলের একটি নির্ধারিত সংশোধনী কমিটি রয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে মাঠ পর্যায়ের প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। এরপর নির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে প্রতিটি ধারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। গত ২৬ জুন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই সংশোধনীগুলোর বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি শুরা সদস্যদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পষ্ট করেছেন যে, জামায়াত কোনো বিষয় গোপন রাখতে বিশ্বাসী নয়। গঠনতন্ত্রের সমস্ত সংশোধনী এবং দলীয় সিদ্ধান্তগুলো নিয়ম অনুযায়ী দলের নিজস্ব ওয়েবসাইটসহ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের গঠনতন্ত্রের প্রতিটি পদক্ষেপ দলের গঠনতন্ত্রের বিধি মেনেই তারা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া আরও বেশ কিছু ধারায় সময়ের প্রয়োজনে পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হচ্ছে, যা সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামায়াতের এই কাঠামোগত পরিবর্তন তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের ইমেজ বজায় রাখতে এবং আগামী দিনের জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত সময়োপযোগী। দলটির অভ্যন্তরে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগটি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটিও শক্ত করবে বলে মনে করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে, জামায়াতের এই ১৪ সংশোধনী কেবল একটি সাংগঠনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার দিকে এক সুদূরপ্রসারী যাত্রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত