প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজপথে এখন এক অস্থির ও ভয়ার্ত পরিবেশ। জোহানেসবার্গের ঘিঞ্জি এলাকা থেকে শুরু করে উপকূলীয় শহর ডারবান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অভিবাসনবিরোধী তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ। দেশটির স্থানীয় নাগরিকদের একাংশ সংগঠিত হয়ে ঘরবাড়ি থেকে বিদেশি নাগরিকদের বের করে এনে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো উদ্বেগজনক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার নামে এই নগ্ন অভিযানের ফলে পুরো দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে সহিংসতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা, যা আফ্রিকার এই দেশটির সামাজিক স্থিতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জোহানেসবার্গের আলেকজান্দ্রা এলাকায় বৃহস্পতিবার এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীরা দলবদ্ধ হয়ে ঘরবাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করতে তল্লাশি চালায়। এই অভিযানের সময় বৈধ কাগজপত্র বহনকারী ব্যক্তিরাও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এমন একজন জিম্বাবুয়েন নাগরিক টোটাল এমহলাঙ্গা, যিনি বৈধ ‘জিইপি’ কার্ডধারী হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের রোষানলে পড়েছিলেন। তার মতো হাজার হাজার মানুষ, যারা বৈধভাবে কাজ ও বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন, তারাও এখন নিজেদের ঘরে নিরাপদ বোধ করছেন না। এই মিছিলের ভয়াবহতা কেবল আলেকজান্দ্রাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সোয়েটো এলাকাতেও লাঠিসোটা ও পতাকা হাতে মিছিলকারীদের দাপট দেখা গেছে। আন্দোলনকারীরা পরিকল্পিতভাবে লিফলেট বিলি করে হুমকি দিয়েছিল, যার ফলে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এই অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছেন সাবেক রেডিও উপস্থাপক জাসিন্তা এনগোবেসে-জুমা। তার নেতৃত্বে প্রতি বৃহস্পতিবার এই ধরনের উসকানিমূলক কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সামাজিক সেবার সংকটের জন্য অভিবাসীরাই দায়ী। তারা সরকার ও প্রশাসনের কাছে কঠোর দাবি জানিয়েছে যেন সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়, অবৈধদের গণহারে বহিষ্কার করা হয় এবং স্কুল-হাসপাতালের মতো জরুরি সেবায় স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাদের এই দাবিগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, অনেকেই না বুঝেই এই বিদ্বেষী প্রচারণার অংশ হয়ে পড়ছেন।
অথচ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বারবার জনগণকে সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য অভিবাসীদের এককভাবে দায়ী করা কেবল ভুল নয়, বরং এটি একটি বিপজ্জনক প্রবৃত্তি। তিনি নাগরিকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা কাউকে জোরপূর্বক আটক করার আইনি অধিকার সাধারণ মানুষের নেই। পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর আস্থা না রেখে সাধারণ মানুষ যেভাবে বিচারকের ভূমিকা পালন করছে, তা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য চরম অবমাননাকর। কিন্তু রাষ্ট্রপতির এই বার্তা যেন ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে পারছে না।
এই অমানবিক অভিযানের ফলে ইতোমধ্যেই মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। মালাউই সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ৩৮ হাজারের বেশি মালাউয়ি নাগরিক নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। জিম্বাবুয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ, যেখানে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ সহিংসতা ও বৈষম্যের ভয়ে সহায়-সম্পদ ফেলে স্বদেশে ফিরে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারা প্রতিটা রাত কাটাচ্ছেন চরম উৎকণ্ঠায়। মা ও তার ছোট সন্তানের মতো অসহায় ব্যক্তিরাও এই অভিযানে রেহাই পাচ্ছেন না, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীদের নিয়ে এই বিদ্বেষ আসলে একটি বড় সামাজিক ফাটলের সংকেত দেয়। যখনই কোনো দেশের অর্থনীতির চাকা মন্থর হয়, তখন স্থানীয়রা বহিরাগতদের ওপর দায় চাপানোর সহজ উপায় খুঁজে নেয়। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে নতুন কোনো ঘটনা না হলেও, এবারের মাত্রা ও ভয়াবহতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক ইন্ধন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের কারণে বিদ্বেষের এই দাবানল পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা কর্মসংস্থান ও পারিবারিক বন্ধন এক মুহূর্তের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক বিদেশি নাগরিক যারা বছরের পর বছর দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন, তারা আজ অপদস্থ ও আতঙ্কিত। তাদের অর্জিত সম্পদ ও সম্মানের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, সরকার চাইলেও দ্রুত সমাধান করতে পারছে না, কারণ সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া এই বিষবাষ্প দূর করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সচেতনতা ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান, যাতে কোনোভাবেই জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার এই অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত মহাদেশীয় রাজনীতি ও বাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। যদি সরকার দ্রুত এই বিদ্বেষী প্রচারণা বন্ধ করতে না পারে, তবে এটি শুধু বৈদেশিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে না, বরং দক্ষিণ আফ্রিকার ভেতরে একটি স্থায়ী বিভাজন ও সংঘাতের সংস্কৃতি তৈরি করবে। আজকের জোহানেসবার্গের এই আতঙ্ককাল যেন অন্য কোনো দিন অন্য কোনো দেশ ও সমাজের জন্য উদাহরণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।