প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত চার দিন ধরে চলা রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। অবিরাম বারিধারায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা, ভয়াবহ পাহাড়ধস এবং নজিরবিহীন জলাবদ্ধতায় জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিশুসহ অন্তত ৩০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো দেশে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সাথে, রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকায় আটকা পড়া পর্যটকদের দ্রুত উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছে দলটি।
শুক্রবার সকালে এনসিপির দপ্তর সেলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগ ও আশঙ্কার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশেষ করে একদিনেই সাতটি শিশুর প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং হৃদয়বিদারক। কোনো অবস্থাতেই এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। দলটি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে। দুর্যোগের এই মুহূর্তে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন ও সহায়তার আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। টানা ভারী বর্ষণের ফলে নগরীর অধিকাংশ এলাকা দ্বিতীয় দিনের মতো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে আছে। জলমগ্ন রাস্তাঘাটে জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভয়াবহ এই জলাবদ্ধতার কারণে রেললাইনের ওপর পানি জমে যাওয়ায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে পর্যটন খাতের ওপর যেমন আঘাত এসেছে, তেমনি নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীরাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাঙ্গামাটি অঞ্চলে। সেখানে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৪৫০ জন পর্যটক আটকা পড়েছেন। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার-পরিজনের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এনসিপি অবিলম্বে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টার কিংবা উদ্ধারকারী দলের মাধ্যমে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই এখন রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে দলটি মনে করে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিন বৃষ্টিহীন থাকার পর সাগরে লঘুচাপের কারণে এ ধরনের তীব্র ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামের এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ধসের মতো মানবিক বিপর্যয়গুলো পুনরাবৃত্তি ঘটলেও তা নিরসনে যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এনসিপি মনে করে, প্রতিটি দুর্যোগের পরেই কেবল ত্রাণ বিতরণ করাই সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এনসিপি দাবি করেছে, শুধু সাময়িক পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের কষ্ট লাঘব সম্ভব নয়। পাহাড়ের পাদদেশে যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে যে ধরনের মানবসৃষ্ট দুর্যোগ তৈরি হচ্ছে, তা প্রতিরোধ করতে কঠোর আইন ও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারকে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হবে।
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এনসিপির কর্মীরা দুর্গত এলাকায় মানুষের সহায়তায় কাজ শুরু করলেও সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছে দলটি। সব রাজনৈতিক দলের উচিত এমন মানবিক সংকটের মুহূর্তে বিভেদ ভুলে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এনসিপি তাদের বক্তব্যে বলেছে, দেশের মানুষ যখন বিপদের সম্মুখীন হয়, তখন সরকারের দায়বদ্ধতা বহুগুণ বেড়ে যায়। আশা করা হচ্ছে, সরকার দ্রুততার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় পাহাড় রক্ষা ও ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নয়নের মতো স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।