প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য আর অসহনীয় তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে এখন জ্বলছে ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। স্পেনের আলমেরিয়া প্রদেশের লস গালিয়ার্দোস এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের গ্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১২ জন সাধারণ মানুষ। এই ট্র্যাজেডিতে আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। আগুন, ধোঁয়া আর উত্তপ্ত বাতাসের রুদ্রমূর্তি পুরো এলাকাকে শ্মশানে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, দগ্ধ গাড়িগুলোর ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া লাশগুলো দেখে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদেরও চোখে জল চলে এসেছে। শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লস গালিয়ার্দোস এলাকার আকাশ এখন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।
দাবানল কীভাবে শুরু হলো, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, এলাকাটির পাশ দিয়ে যাওয়া একটি বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে পড়ার ফলেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। সেই স্ফুলিঙ্গ বাতাসের বেগে মুহূর্তের মধ্যে পাশের শুষ্ক বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রীষ্মের দাবদাহে বনের শুকনো গাছপালা বারুদের মতো কাজ করেছে। আগুন যখন লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন অনেকেরই গাড়ি নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালানোর চেষ্টা ছিল বিফলে। অনেকের প্রিয়জন নিখোঁজ হয়েছেন, গাড়িগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে পাওয়া গেছে মর্মান্তিক পরিণতির স্বাক্ষর। যদিও কর্তৃপক্ষ আগুন লাগার প্রকৃত কারণ হিসেবে এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চরম আবহাওয়া যে এই দুর্যোগের মূল অনুঘটক, তা এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
আন্দালুসিয়া আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ানমা মোরেনো এই ঘটনাকে একটি গভীর জাতীয় ট্র্যাজেডি বলে আখ্যায়িত করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম এক্সে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এটি এমন এক ক্ষত যা সারাজীবন শুকাবে না। দাবানলের তীব্রতা প্রশমনে এখন প্রায় ১৫০ জন দমকলকর্মী ও জরুরি উদ্ধারকারী দল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লস গালিয়ার্দোসে কাজ করে যাচ্ছেন। আহতদের মধ্যে যারা হাসপাতালে ভর্তি আছেন, তাদের অনেকেই ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের শিকার। দগ্ধ ও ধোঁয়ায় অসুস্থ অনেকের চিকিৎসা ঘটনাস্থলেই দেওয়া হয়েছে। জরুরি সেবার আওতায় প্রায় এক হাজার বাসিন্দাকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গত মে মাসেই ঘোষণা করেছিলেন যে, এবারের গ্রীষ্মে দাবানল মোকাবিলায় স্পেন তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন স্পেনের সামরিক জরুরি ইউনিট (ইউএমই) আগুন নেভানোর কাজে যোগ দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষের কাছে প্রযুক্তির সেই আয়োজনও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের জুন মাসে স্পেনে ১৯৫০ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তাপমাত্রার পারদ ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাসের সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক এলাকা দাবানলের কবলে পড়ছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশ—যেমন ফ্রান্স ও পর্তুগালেও একই চিত্র ফুটে উঠছে, যা পুরো মহাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত।
ইউরোপীয় ফরেস্ট ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্পেনে প্রায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর বনভূমি দাবানলে ভস্মীভূত হয়েছে। এটি ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণেরও বেশি। এই তথ্যই বলে দিচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় এখানে প্রায় দ্বিগুণ হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দাবানল কেবল একটি মৌসুমী দুর্যোগ থাকবে না, বরং এটি হয়ে উঠবে ইউরোপের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
লস গালিয়ার্দোসের বাতাস এখন উত্তপ্ত আর পোড়া গন্ধযুক্ত। যেসব মানুষ চিরচেনা বাড়ি ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে আশ্রয় শিবিরে ছুটছেন, তাদের চোখেমুখে কেবলই আতঙ্ক। এই সংকট কেবল স্পেনের নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়ংকর ছোবল আমরা প্রতিনিয়ত দেখছিলাম, স্পেনের এই ঘটনা তাকে এক নতুন ও নিষ্ঠুর উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছর ইউরোপজুড়ে এমন ভয়াবহ ও ঘনঘন দাবানল দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু দমকল বাহিনী দিয়ে কি এই দানবীয় অগ্নিকাণ্ড থামানো সম্ভব? নাকি আমাদের জীবনযাত্রায় আরও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন? সরকার ত্রাণ পাঠাচ্ছে, সামরিক বাহিনী নামাচ্ছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারগুলোর শূন্যতা কি পূরণ হওয়ার মতো? লস গালিয়ার্দোসের এই ঘটনা বিশ্বনেতাদের এবং সাধারণ নাগরিকদের মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীটা এখন অগ্নিগর্ভ। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমাদের এখনই টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, নতুবা প্রতিটি গ্রীষ্মই হয়ে উঠবে মানবজাতির জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। স্পেনের এই শোকের দিনে বিশ্ববাসী প্রার্থনা করছে যেন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে আগুনের এই লেলিহান শিখা এবং যেন আর কোনো প্রাণ ঝরে না পড়ে।