প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি দেশের কোটি মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল প্রকল্পটিকে কেবল প্রতিশ্রুতির ফাইলে বন্দি না রেখে এর কাজ দৃশ্যমান করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি দেশের জ্বলন্ত ইস্যুগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সরকারি অঙ্গীকার যেন কেবল লোক দেখানো না হয়, বরং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সামনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এর দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি এই তিস্তা প্রকল্পের সাথে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রকল্পটি আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সরকার যখন অঙ্গীকার করেছে, তখন জনগণের প্রত্যাশা হলো তারা যেন কাজের প্রতিফলন দেখতে পায়। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ, আমরা স্বীকার করি এটি বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন আছে, তবে আন্তরিকতা থাকলে কাজের অগ্রগতি জনসমক্ষে আসা অত্যন্ত জরুরি। জনগণ কোনো কালক্ষেপণ দেখতে চায় না, তারা চায় প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ যেন সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
চট্টগ্রামের চলমান জলাবদ্ধতার মতো একটি মানবিক ও প্রশাসনিক সংকট নিয়েও জামায়াতের আমির গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এই নগরীর অর্থনীতির ওপর পুরো বাংলাদেশের উন্নয়ন নির্ভরশীল। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো, সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরের বিশাল এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়, যা বাণিজ্যিক শহরের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও অগ্রহণযোগ্য। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। নালা-নর্দমা উপচে পড়া পানি যখন ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখার কেউ থাকে না। সরকারের উচিত এই সমস্যাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
রাজনৈতিক দল হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই জামায়াতে ইসলামী দেশের এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে কথা বলছে বলে তিনি জানান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দুর্ভোগের কথা নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কর্তব্য। দেশের এই সংকটাপন্ন সময়ে শুধুমাত্র সমালোচনা না করে তারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছেন। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি আজ চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত বাঁশখালী উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছেন। এটি কেবল ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং বিপন্ন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের একটি অঙ্গীকার।
বাঁশখালীর বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। সেখানে দুর্গত মানুষের অভাব, খাদ্য সংকট ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রতিনিয়ত তাদের কানে আসছে। জামায়াতের আমির জানান, দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কোনো ভেদাভেদ না করে প্রতিটি বন্যাদুর্গত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যান। সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহায়তা নিয়ে মানুষের দুঃখ লাঘব করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, বিপদগ্রস্ত মানুষ যখন রাষ্ট্রের সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত বোধ করে, তখন রাজনৈতিক দল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সব সময় মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবে। তিনি সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান যে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের পরামর্শে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো মেগাপ্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। দেশের সম্পদ যেন অপচয় না হয় এবং প্রতিটি প্রকল্পের সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।
তার কথায় উঠে আসে এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং দেশ কোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়বে না। তিনি বলেন, আমরা একটি বৈষম্যহীন সমাজ চাই। যে সমাজ ব্যবস্থায় একজন কৃষক বা শ্রমিক বন্যার মতো দুর্যোগে পড়লে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া পাবে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক।
চট্টগ্রামের বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে ডা. শফিকুর রহমান বন্যাকবলিত বাঁশখালীর দুর্গত এলাকাগুলোর দিকে রওনা হন। সাধারণ মানুষের দুঃখের অংশীদার হওয়ার এই সফর রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। ডা. শফিকুর রহমানের এই দাবিগুলো কেবল একটি দলের বক্তব্য নয়, বরং আজ দেশের সাধারণ মানুষের মনের কথাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা আর চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন— এই দুই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কতটা আন্তরিক ভূমিকা পালন করে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।