প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরাঞ্চলীয় জেলা সুনামগঞ্জে আবারও বন্যার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শাল্লা উপজেলার মারকুলি স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে। সুরমা ও কুশিয়ারার তীরবর্তী জনপদগুলোতে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার পরিমাপে সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি নদী পরিমাপ কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতেই পানির উচ্চতা ঊর্ধ্বমুখী। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানির স্তর ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৩০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা যদিও এখনো বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে, তবুও পানির গতিপ্রকৃতি দেখে স্থানীয়রা চিন্তিত। অন্যদিকে ছাতক স্টেশনে সুরমা নদীর পানি ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ৮ দশমিক ৩৮ মিটার উচ্চতায় বইছে এবং বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই ধারাবাহিক পানি বৃদ্ধি যেকোনো সময় বন্যাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন।
পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করেছে শাল্লা উপজেলার মারকুলি স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে। নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার অর্থ হলো নদীর তীরবর্তী নিচু জমি ও ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। স্থানীয় কৃষকরা তাদের ফসলি জমি ও গবাদিপশু নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। যদিও লাউড়েরগড় স্টেশনে যাদুকাটা নদীর পানির উচ্চতা ৪২ সেন্টিমিটার কমে ৭ দশমিক ২৮ মিটারে নেমে এসেছে এবং এটি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবুও সামগ্রিক বিবেচনায় জেলার নদ-নদীগুলোর ভারসাম্যহীনতা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। দিরাইয়ে পুরাতন সুরমা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে ৫ দশমিক ৮১ মিটার উচ্চতায় বইছে, যা বিপদসীমার অনেকটা নিচেই রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় রেকর্ড করা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জনজীবনে বিপত্তি বয়ে এনেছে। লাউড়েরগড় স্টেশনে সর্বোচ্চ ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জেলার অন্যান্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি। সুনামগঞ্জ সদর ও এর আশেপাশের এলাকায় ৭৭ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ২০ মিলিমিটার এবং ছাতকে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের এই সমন্বয় সুনামগঞ্জের জনজীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে। বন্যার স্মৃতি এখনো অনেকের কাছেই দুঃসহ, তাই পানির সামান্য বৃদ্ধি দেখলেই মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, উজানের ঢল আর বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে না পারলে প্লাবনের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল ও নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষিপ্রধান এই জেলায় আগাম বন্যার পূর্বাভাস সবসময়ই আতঙ্কের। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নিচু এলাকার অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেক স্থানেই কাঁচা রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা গুজবে কান না দিয়ে সরকারি সতর্কবার্তার দিকে খেয়াল রাখেন। বন্যার এই মৌসুমে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় মজুদ গড়ে তোলার জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে যাতে বন্যাকালীন যেকোনো রোগব্যাধি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সুনামগঞ্জের নদীমাতৃক জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে জল ও জীবনের লড়াই। এবারের পানি বৃদ্ধি যেন সেই লড়াইয়ের একটি কঠিন অধ্যায়ের সংকেত দিচ্ছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নদ-নদীর পানির স্তর আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ মানুষ দিনরাত আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘ দেখছে আর নদীর পানির উচ্চতা মেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। একটি বাংলাদেশ অনলাইনের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো আবেদন থাকবে যেন দুর্গত মানুষের ত্রাণ ও সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং কোনোভাবেই যেন মানুষ সাহায্য থেকে বঞ্চিত না হয়। সুনামগঞ্জের এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ।