প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। এর পাশাপাশি ভূমিধসের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শঙ্কা ও আতঙ্ক। এই ভয়াবহ মানবিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি সেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজওয়ান খান গণমাধ্যমকে এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তিন পার্বত্য জেলার প্রশাসনিক পরিস্থিতি এবং আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে। জরুরি প্রয়োজনে বা যে কোনো তথ্য আদান-প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঙ্গল চন্দ্র পালের সঙ্গে ০১৭১২-৮৪০৮৩৭ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজিজুল ইসলামের সঙ্গে ০১৭২৬-০০৭৬৯৩ নম্বরে কল করে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যাবে। সরকারের লক্ষ্য হলো পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের কাছে যেন জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো যায়।
টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট এই বন্যায় পার্বত্য অঞ্চলের অন্তত ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। অনেক স্থানেই পাহাড়ি ঢলে রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে মানুষ এখন আশ্রয়হীন হয়ে উঁচু স্থানগুলোতে কিংবা নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় সাধারণ মানুষকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতির তাণ্ডবে বহু মানুষের জীবনযাত্রা আজ স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বিপন্ন মানুষদের উদ্ধার তৎপরতা চালাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নিরলসভাবে মাঠে কাজ করছেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে উদ্ধারকর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছেন, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে মানবিক বিপর্যয় রোধে সব ধরনের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে উদ্ধারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরাও আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে যাতে দ্রুত তাদের হাতে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস একটি নিয়মিত আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়ে এবং ভূমিধসের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অবস্থায় মানুষের জীবন রক্ষা করা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্থাপিত এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের উদ্ধারকারী দল ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে একটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করবে। ফলে যেকোনো এলাকায় বড় কোনো বিপদের সংকেত পাওয়া মাত্রই দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
শুধু পার্বত্য অঞ্চল নয়, দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায়ও দুর্যোগের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, সমুদ্র বন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে, যা জনজীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। এমতাবস্থায়, পাহাড়ের বাসিন্দাদের পাশাপাশি উপকূলের মানুষকেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ পাহাড়ের মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ে সাহস জোগাচ্ছে।
আমরা লক্ষ্য করছি, প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড়ের মানুষ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সাথে এক নিষ্ঠুর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়া, ফসলের ক্ষতি এবং প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলো আমাদের এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। মন্ত্রণালয়ের এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপনের উদ্যোগটি প্রশংসার দাবি রাখে, তবে পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা। পাহাড় কাটা বন্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পাহাড়ের মাটি মজবুত করা গেলেই কেবল এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
বর্তমানে পুরো পার্বত্য অঞ্চল এখন দুর্যোগের কবলে। এই বিপদের দিনে প্রয়োজন সংহতি ও মানবিকতা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতদিন পরিস্থিতির উন্নতি না হবে, ততদিন এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। দুর্যোগকবলিত এলাকায় প্রতিটি মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। আমরা আশা করি, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য অঞ্চলের এই দুর্যোগ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা আবারও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার শক্তি অর্জন করবেন। যারা বিপদগ্রস্ত, তাদের যেন কোনোমতেই সাহায্য প্রাপ্তিতে দেরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের এই কার্যকর তদারকি অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করি।