প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যশোরের অভয়নগরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ মোটরসাইকেল চালক তারেক মল্লিক। রোববার রাতে উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিহতের সহকর্মী শান্ত ইসলাম। ঘাতক ট্রাকটি ঘটনার পরপরই দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে পুলিশ অপরাধীকে ধরতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একটি জানাজা শেষে বাড়ি ফেরার পথেই যে এমন অকাল মৃত্যুর হাতছানি ছিল, তা হয়তো কারোরই কল্পনায় ছিল না।
ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মরহুম ইদ্রিস মোল্যার জানাজা শেষে শংকরপাশা জামে মসজিদের সামনের সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে করে নিজ গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন তারেক মল্লিক ও শান্ত ইসলাম। তারেক মল্লিক অভয়নগরের চলিশিয়া ইউনিয়নের চলিশিয়া গ্রামের বাচ্চু মল্লিকের ছেলে এবং শান্ত ইসলাম একই উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে। পেশাগত জীবনে তারা দুজনেই নওয়াপাড়া বাজারের একটি সার ও কয়লা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। জানাজা শেষে সহকর্মীর সাথে বাড়ি ফেরার এই যাত্রা যে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা হবে, তা কে জানত!
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, শংকরপাশা জামে মসজিদের সামনের সড়কে মোটরসাইকেলটি পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া গতির ট্রাক পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। আকস্মিক এই ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে দুজনই ছিটকে পড়ে যান। ট্রাকের চাকা চালক তারেক মল্লিকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, আরোহী শান্ত ইসলাম গুরুত্বর জখম হয়ে রাস্তায় পড়ে কাতরাতে থাকেন। বিকট শব্দ এবং আর্তনাদ শুনে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আহত শান্ত ইসলামকে উদ্ধার করে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করে চিকিৎসা সেবা শুরু করেন।
সড়ক দুর্ঘটনা আজ যেন বাংলাদেশের প্রতিটি পথের এক নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অদক্ষ ড্রাইভিং, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং নিয়ম না মেনে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায় প্রতিদিনই অকালে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। অভয়নগরের এই দুর্ঘটনাটি আরও একবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের সড়ক নিরাপত্তার ভঙ্গুর অবস্থাকে। একটি জানাজা থেকে ফেরার মতো শোকাবহ পরিবেশের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি জানাজা আয়োজনের প্রস্তুতির এই বেদনা সহ্য করা কতটা কঠিন, তা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারই জানে। তারেকের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে মাতম, আর সহকর্মীরা হারিয়েছেন একজন সদা হাস্যোজ্জ্বল বন্ধুকে।
ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্রই অভয়নগর থানা পুলিশ দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তারেক মল্লিকের নিথর দেহ উদ্ধার করে। থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঘাতক ট্রাকটি ও তার চালককে শনাক্ত করতে তারা সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করছে। অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পালিয়ে যাওয়া ঘাতক ট্রাকটিকে খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন রুটে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহসহ তদন্তকাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা যেন কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসে, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং চালকদের মধ্যে সচেতনতা এবং ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। বিশেষ করে রাতে ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং গতির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা অনেক ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভয়নগরের এই তরুণ প্রাণ তারেক মল্লিকের মৃত্যু পরিবারের জন্য যেমন অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি আর কতদিন এমন অকাল মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকব? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিটি সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
তারেক মল্লিকের পরিবারে এখন শোকের মাতম। যে তরুণটি কয়েক ঘণ্টা আগেও কর্মস্থল থেকে ফিরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তার এমন করুণ পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন। স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজসেবীদের উচিত এই শোকাতপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। শান্ত ইসলামের দ্রুত আরোগ্য কামনায় আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীরা এখন প্রার্থনায় মগ্ন। আমরা আশা করি, অভয়নগর থানা পুলিশের তদন্তে ঘাতক ট্রাক চালক অচিরেই গ্রেফতার হবে এবং আইনের মাধ্যমে যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি হবে। আজকের এই শোকাবহ ঘটনা যেন অভয়নগরের সড়কে শেষ দুর্ঘটনা হয়ে থাকে এবং ভবিষ্যতে আমরা এমন আর কোনো তরতাজা প্রাণ অকালে হারিয়ে না ফেলি। সড়ক হোক নিরাপদ, প্রতিটি যাত্রায় বেঁচে থাকুক স্বপ্ন—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।