প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালে এক তরুণ ইজিবাইকচালকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, স্বজনদের ক্ষোভ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর এবং প্রশাসনের তদন্তের আশ্বাস—সব মিলিয়ে জেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রোববার রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন চিকিৎসাসেবার মান ও জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুরের ঘটনাও জননিরাপত্তা ও চিকিৎসা পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিহত তরুণের নাম সজীব মিয়া (২৩)। তিনি নেত্রকোনা পৌর শহরের আমগাছতলা এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ইজিবাইকচালক ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যায় হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা ও বারবার বমি শুরু হলে তাঁকে দ্রুত নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। পরিবারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে দেরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘটে।
স্বজনদের দাবি, হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি সামনে এনে দায়িত্বরত চিকিৎসক যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারেননি। তাঁদের অভিযোগ, সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হলে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাতের মধ্যেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ লোকজন একপর্যায়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালান। এতে জরুরি বিভাগের কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং একটি দরজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ডায়রিয়া ওয়ার্ডেরও কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে খবর পেয়ে নেত্রকোনা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় বিক্ষুব্ধ স্বজনদের শান্ত করা হয়। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এদিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার সময় হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও জেনারেটরের মাধ্যমে জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু ছিল। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মাজহারুল আমিন জানান, রোববার রাত ৮টা ৮ মিনিটে সজীব মিয়াকে জরুরি বিভাগে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরপরই তাঁর ইসিজি করা হয় এবং পরীক্ষায় দেখা যায়, তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে ছিলেন। তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি রোগীর স্বজনদেরও জানানো হয়েছিল। তবে তাঁকে স্থানান্তরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসাকর্মীরা তাঁদের সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিদ্যুৎ না থাকলেও জেনারেটরের মাধ্যমে জরুরি সেবা চালু ছিল এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ই অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল বলে দাবি তাঁদের।
এ ঘটনায় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক একরামুল হাসান বলেছেন, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের অবকাঠামোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
দায়িত্বরত চিকিৎসক সুজন পালের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেশি হলেও জনবল, যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো পরিস্থিতিতে জরুরি সেবা অব্যাহত রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও তাঁদের মত।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুর বা সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাসেবাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ফলে অভিযোগের যথাযথ তদন্তের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঘটনার সার্বিক দিক তদন্ত করা হবে।
ঘটনার পর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন তরুণ কর্মজীবী মানুষের আকস্মিক মৃত্যু এবং তাকে ঘিরে চিকিৎসা নিয়ে বিতর্ক জেলার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও নিহত সজীব মিয়ার পরিবার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তেই পরিষ্কার হবে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না। তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সবাই।