১৭ বছর পর ঢাকায় রেকর্ড বৃষ্টি, আরও পাঁচ দিন সতর্কতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
১৭ বছর পর ঢাকায় রেকর্ড বৃষ্টি, আরও পাঁচ দিন সতর্কতা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে টানা বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দৈনিক বৃষ্টিপাতের অন্যতম রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই প্রবল বর্ষণ হচ্ছে এবং আগামী অন্তত পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালে এক দিনে ঢাকায় ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা এখনো সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবারও রাজধানীতে এত বড় মাত্রার বৃষ্টিপাত নগরবাসীর জন্য নতুন করে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। নিম্নাঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেক এলাকায় যানবাহনের গতি কমে যায়, ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। কোথাও কোথাও বাসাবাড়ি, দোকানপাট এবং অলিগলিতেও পানি ঢুকে পড়ে। নগরবাসীর অভিযোগ, স্বল্প সময়ের ভারি বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। এ কারণেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা এবং ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হলেও এবারের মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কিছু এলাকায় অল্প সময়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে।

শুধু ঢাকাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ১৬০ মিলিমিটার, আমবাগানে ১৪০ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ১১৩ মিলিমিটার এবং ফরিদপুরে ১১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসব এলাকায়ও জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

১৩ জুলাইয়ের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ স্থানে এবং ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের কয়েকটি এলাকায় ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের আশঙ্কাও রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে, তবে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।

১৪ জুলাই রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অনেক স্থানে এবং দেশের অন্যান্য বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় ভারি বর্ষণ হতে পারে। এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ১৫ ও ১৬ জুলাই খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক স্থানে এবং দেশের অন্যান্য বিভাগের কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ সময়ও কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। দিনের এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ভারি বর্ষণের ফলে শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় ফসলের জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এবং নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতে পারে।

ইতোমধ্যে ভারি বর্ষণের ভয়াবহ প্রভাব দেখা গেছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গামাটিতে তিনজন, বান্দরবানে ছয়জন, কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন। তাদের মধ্যে কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুজন এবং খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদেরও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিভারি বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে নগর পরিকল্পনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

রাজধানীতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বর্ষণের এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলা, বজ্রপাতের সময় নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এখনই কমার কোনো লক্ষণ নেই। ফলে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত