দুবাইয়ে আটকের এক মাস, বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
দুবাইয়ে আটকের এক মাস, বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আটক হওয়ার এক মাস পূর্ণ হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার কূটনৈতিক ও আইনগত বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রাখলেও এখন পর্যন্ত তাঁর প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ইতিবাচক অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বহুল আলোচিত এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা বাংলাদেশ পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে। পরে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছায় এবং আটকের দুই দিন পর জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন। এরপর থেকেই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়।

সরকারি সূত্র জানায়, ১৯ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাসংক্রান্ত ২৪৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নথিপত্র দুবাই পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। ওই নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্তাধীন মামলা এবং অন্যান্য আইনি তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে। তবে এক মাস পেরিয়ে গেলেও সে ধরনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

সরকারি নথি অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত ১৭টি মামলার পরোয়ানা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছয়টি মামলার তথ্য এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তিনটি মামলার পরোয়ানার বিষয়ও দুবাই কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের পক্ষে আইনগত অবস্থান তুলে ধরেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সরকার শুধু আনুষ্ঠানিক নথি পাঠিয়েই থেমে থাকেনি; পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েও নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে বলে জানা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁকে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও নানা আলোচনা রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি নির্ধারিত ফ্লাইটে যাত্রার প্রস্তুতিকালে নিয়মিত ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বেনজীর আহমেদের পরিচয় যাচাই করা হয়। বিমানবন্দরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় আন্তর্জাতিক অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে ইন্টারপোলের সতর্কতা সংকেত শনাক্ত হয়। পরে বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা তাঁকে আটক করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দেশে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম এবং অন্যান্য আলোচিত ঘটনার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি অতীতে বিভিন্ন সময়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও বর্তমানে সেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন আদালতে চলমান রয়েছে।

মানবাধিকার ইস্যুতেও বেনজীর আহমেদের নাম আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন তদন্ত আরও গুরুত্ব পায়।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি তৎকালীন সরকারের সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাইয়ে যান। এরপর থেকে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় আদালতের নির্দেশনা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রক্রিয়া শুরু হলে তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী আইনি ও কূটনৈতিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

বেনজীর আহমেদ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সাধারণত সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইন, পারস্পরিক চুক্তি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। ফলে কোনো ব্যক্তিকে আটক করার পরই দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, প্রশাসন এবং কূটনৈতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক একজন পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় এবং বহুল আলোচিত মামলাগুলোর কারণে পুরো বিষয়টি শুধু আইনগত নয়, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ বিষয়ে সরকার কীভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, তা আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এক মাস পার হলেও বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ অব্যাহত রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক যোগাযোগের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত